
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্র ডিসি হিলে আর সি আরবিতে। এ বার চট্টগ্রামের জেলা প্রসাশকের আয়োজনে নতুন বছরকে বরণ করার জন্য একদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।বৈশাখী শোভাযাত্রা সকাল ৯ টায় শুরু হবে কাজির দেউরী থেকে।বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল’ না ‘আনন্দ’—এই বিতর্কের অবসান হয়েছে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর ঘোষণায়। তিনি জানিয়েছেন, শোভাযাত্রাটি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামেই অনুষ্ঠিত হবে। মুক্ত মঞ্চে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।রাস্তায় থকবে নানা প্রামীণ পন্যের পশরা। পান্তা ইলিশের ব্যবস্থাও থাকবে। চট্টগ্রামে সম্মিলিত ভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উদ্যোগ ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিকগণের চেষ্টায় ইস্পাহানী পাহাড়ের পাদদেশে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো। ১৯৭৮ সালে থেকে এই উৎসাব ডিসি হিল পার্কে পালন করা হয়ে থাকে। ১৯৮০ সাল থেকে সংগঠনগুলো আলাদাভাবে গাণ পরিবেশন শুরু করে। পরে গ্রুপ থিয়েটার সমন্বয় পরিষদ যুক্ত হওয়ার পর অনুষ্ঠানে নাটকও যুক্ত হয়। পহেলা বৈশাখ বাঙালির একমাত্র সর্বজনীন বড় উৎসব। একমাত্র সার্বজনীন উৎসব এ কারণে যে এই উৎসবে সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং করতে পারে।
এ ছাড়া বাকি যে বড় উৎসবগুলো আছে, যেমন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সে উৎসব মুসলিম সম্প্রদায়ের। দুর্গাপূজা ও শ্যামাপূজার উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের। বড়দিনের উৎসব খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের। পারস্পরিক সম্প্রীতির কারণে অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও উল্লেখিত উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ করে বটে কিন্তু সে উৎসব নিজের উৎসব বলে আত্মমগ্ন হতে পারে না। একমাত্র পহেলা বৈশাখের উৎসবকে সবাই নিজের বলে আনন্দে আত্মমগ্ন হয়।
সম্প্রদায়গত বাধা থাকে না। সব সম্প্রদায়ের মানুষ মন-প্রাণ উজাড় করে এই উৎসবে একাত্ম হতে পারে। এভাবেই পহেলা বৈাশাখ বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। শুরুটা হয়েছিল সম্রাট জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের হাত ধরে, ১৫৮৪ সালে। খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বঙ্গ অঞ্চলে সম্রাট তার নবরত্নের পরামর্শে বৈশাখ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরে বছর গণনা শুরু করেন। যার নাম হয় বঙ্গাব্ধ। ফসলি সন হিসেবে প্রবর্তিত হয়ে বর্তমানে বাঙালির জাতিসত্ত্বা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পালিত হয় নববর্ষের উৎসব। তারপর শত শত বছরের নানা উত্থান-পতনে বৈাশাখ মাস বাঙালি সংস্কৃতির হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং এর শেকড় বাঙালি হৃদয়ে এমনভাবে প্রথিত হয়েছে যে এর শেকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা করলে বাঙালি প্রতিবাদে ফুসে ওঠে।
ভাষা এবং স্বাধীনতার মতো পহেলা বৈশাখ উদযাপনও নানা প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে এখনও সেই পুরোনো প্রতিকূলতা পিছু ছাড়েনি। অনেকেই বর্ষবরণ পছন্দ করে না। একটি সম্প্রদায় এর মধ্যে ধর্ম খোঁজে।
পহেলা বৈশাখের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম দুজনই বিশেষভাবে জড়িয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া বৈশাখ চলে না। তার গান দিয়েই শুরু হয় বৈশাখ উৎসব। এসব দেখে পাকিস্তান সরকার এবং তাদের এ দেশীয় পেয়ারের লোকদের গায়ে জ্বালা ধরে যায়। তারা রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা শুরু করে। সেই একই কথা পাকিস্তানি শাসকশ্রেণিও কঠিনভাবে ভাবতে শুরু করে এবং ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে ঘোষণা দেন যে, ‘রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ করা হবে বা সীমিত করা হবে।’
পাকিস্তান সরকারের বাঙালি সংস্কৃতি দমনের প্রতিবাদে এ দেশের সংস্কৃতি কর্মীরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। নেতৃত্বের ভূমিকায় আসে ছায়ানট। এই জন্য ছায়ানটের ওপর মৌলবাদীদের এত রাগ। ছায়ানট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। ১৯৬৭ সালেই বাঙালি সংস্কৃতি দমনের প্রতিবাদে ছায়ানট পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুলের গান দিয়ে বর্ষবরণ। তারপর এটাই যেন পহেলা বৈশাখের শুরুর ঐতিহ্য হয়ে গেছে।
বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষ্যে তারা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। সেসবের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে আবির্ভূত হয় বাংলা নববর্ষ যার স্বাদ, গন্ধ ও আবেদন অন্যান্য উৎসব হতে একেবারেই আলাদা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সব মানুষ, সব বাঙালি সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে সমগ্র জাতি একই হৃদয়াবেগে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে পালন করে এই সর্বজনীন উৎসব। চিরায়ত বাঙালিত্বের অহংকার আর সংস্কৃতির উদার আহ্বানে জাগরুক হয়ে নাচে-গানে, গল্পে-আড্ডায়, আহারে-বিহারে চলে নতুন বছরকে বরণ করার পালা। বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালিদের জীবনে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এর মাধ্যমে জাতি তার স্বকীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তি সঞ্চয় করে; সচেষ্ট হয় আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে। এরূপ নববর্ষই বাঙালি জাতিকে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল, শক্তি ও সাহসের সঞ্চার করে স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল। কবিগুরুর ভাষায়- ‘নব আনন্দে জাগো আজি নব রবির কিরণে শুভসুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে। অমৃত পুষ্প গন্ধ বহ শান্তি পবনে দেহে মনে নির্ভেজাল আনন্দ উপভোগে।’ নববর্ষ বিদায়ী বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালি জীবনে ওড়ায় নতুনের কেতন, চেতনায় বাজায় মহামিলনের সুর। সব ভেদাভেদ ভুলে সব বাঙালিকে দাঁড় করায় এক সম্প্রীতির মোহনায়। নববর্ষের আগমনী ধ্বনি শুনলেই সমগ্রজাতি নতুনের আহ্বানে জেগে ওঠে। গ্রামের জীর্ণ-কুটির হতে বিলাসবহুল ভবন কিংবা দূর প্রবাসের মেগাসিটি- সর্বত্রই প্রবাহিত হয় আনন্দের ফল্গুধারা। আবহমান বাংলার চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার মূলে রয়েছে এক অসাধারণ অনুষঙ্গ; সেটি হল বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বাংলা বর্ষবিদায় ও বরণের অনুষ্ঠানমালা তাই আমাদের সেই ঐতিহাসিক চেতনাকে প্রোজ্জ্বল করে। স্বদেশ মানস রচনায় বাঙালি সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য সর্বোপরী ইতিহাসের আলোকে রক্ষণশীল ও পশ্চাৎপদ চিন্তা-চেতনাকে পরিহার করে আধুনিক ও প্রাগ্রসর অভিধায় জাতিসত্ত্বাকে যথাযথ প্রতিভাত করার সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি বাংলা নববর্ষকে দান করেছে অনবদ্য মাঙ্গলিক যাত্রাপথ। তবে বাঙালির নববর্ষ সব বাঙালির কাছে একভাবে আসেনি। কারও কাছে এসেছে খরা হয়ে, কারও কাছে খাজনা দেওয়ার সময় হিসেবে, কারও কাছে বকেয়া আদায়ের হালখাতা হিসেবে, কারও কাছে মহাজনের সুদরূপে আবার কারও কাছে এসেছে উৎসব হিসেবে।
বাংলা নববর্ষ যেভাবেই আসুক না কেন এখন তা বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। তাই পহেলা বৈশাখ এলেই সব বাঙালির প্রাণ বাংলা নববর্ষ বরণের আনন্দে আপনা আপনিই নেচে ওঠে। পহেলা বৈশাখ তাই পালিত হয় ব্যক্তিগত, ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, শ্রেণিগত অবস্থানের উর্ধ্বে উঠে ‘মানুষ মানুষের জন্য- এই বিশ্বাসকে সমাজ জীবনের সর্বত্রছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। তবে সামাজিক উৎসব হিসেবে নববর্ষ পালন শুরু হয় ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। পঞ্চাশের দশকে লেখক-শিল্পী-মজলিস ও পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ নববর্ষ উপলক্ষে ঘরোয়াভাবে আবৃতি, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও সাহিত্যসভার আয়োজন করত। সনজীদা খাতুনসহ অন্যান্যদের উদ্যোগে ছায়ানটের আয়োজনে কবিগুরুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে বাংলা বছরের প্রথম দিন সকালে নববর্ষের আবাহন শুরু হয় রমনাঅশ্বত্থতলায় ১৯৬৫ সালে। পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার পালে যতই হাওয়া লেগেছে ততই উৎসবমূখর হয়েছে নববর্ষের আয়োজন। পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধকরণসহ সাংস্কৃতিক নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করার পরও নববর্ষে লাগে নিত্যনতুন উদ্দীপনা। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার পহেলা বৈশাখকে জাতীয় পার্বণ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর ছায়ানট ছাড়াও রাজধানীতে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলা একাডেমি, চারুকলা ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নজরুল ইনন্সিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন বাংলা নববর্ষকে মহাউৎসবে পরিণত করেছে। বর্তমানে পল্লীর নিভৃত কুটির হতে শুরু করে গ্রামগঞ্জ, জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ও রাজধানী শহরের সর্বত্র উছলে পড়ে বাংলা নববর্ষ পালনের আনন্দ। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো বাংলা বর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। আর বাঙালিদের কাছে বাংলা নববর্ষ বরণ হলো একটি প্রাণের উৎসব। বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। ইউনেস্কো আমাদের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মুল্যবেধের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বাস সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি প্রদান করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করে নববর্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সাংস্কৃতিক সৌধের ভিত আরও সুদৃঢ় করুক, নববর্ষের উদার আলোয় ও মঙ্গলবার্তায় জাতির ভাগ্যাকাশের সব অন্ধকার দূরীভূত হোক, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গীবাদী অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটুক, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, এটাই হোক বাঙালির প্রত্যয়। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়েছে এ বছর। পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নামকরণ বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে শোভাযাত্রা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পহেলা বৈশাখ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ, যার শিকড় প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজে নিহিত। কৃষিকাজ, ঋতুচক্র ও নতুন বছরের সূচনাকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের বিকাশ ঘটেছে। গ্রামীণ সমাজে বৈশাখকে ঘিরে মেলা, গান, নৃত্য ও নানা লোকজ আয়োজনের মাধ্যমে এ উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। পহেলা বৈশাখ মূলত আনন্দ ও মঙ্গলের প্রতীক। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে অতীতের গ্লানি ভুলে ভবিষ্যতের মঙ্গল কামনা করাই এ উৎসবের মূল দর্শন। তবে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।
এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাদ্যযন্ত্র ও লোকজ উপস্থাপনাকে স্থান দেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে বিভ্রান্তি ও মতবিরোধ দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে। ইউনেস্কো যে স্বীকৃতি ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা করে অনেকে বলেছিল সেটা হয়তো প্রত্যাহার করা হতে পারে। আমাদের দেশে এখন থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রা হবে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি নিয়ে কোনো আশঙ্কা নেই। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর রমনা বটমূলসহ বিভিন্ন স্থানে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এরইমধ্যে এ বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে সবাইকে দায়িত্বশীলভাবে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রকৃতির নিয়মে দেখতে দেখতে শেষ হয় বাংলা সন। বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে। রোদের তাপদাহ বাড়ছে দিন দিন। আকাশে মেঘ জমছে। হঠাৎ বৃষ্টি ঝড় শুরু হয়ে গেছে। প্রকৃতি তার আপন বৈশাখীরূপে সেজে উঠছে। সেই ছোঁয়া লেগেছে শহর, গ্রাম আর শহরতলীতে। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কিভাবে বরণ করবে পহেলা বৈশাখকে। কৃষি কাজের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তনের হাত ধরে পহেলা বৈশাখের যাত্রা শুরু। বাংলা নববর্ষের আগমন আর চৈত্রের বিদায়ে বৈশাখের নবযাত্রা। পহেলা বৈশাখ মানে ঐহিহ্যের আবাহন। বাঙালিয়ানা ধরে রেখে চিরচেনা আনন্দে বববর্ষ বরণ। প্রাণের সুরে আরও একবার মেতে ওঠা বাঙালি উৎসবে। কালের আবর্তে হারিয়ে গেল আরও একটি বছর। ১৪৩২ বিদায় নিচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। নতুন বাংলা বছর ১৪৩৩কে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সবাই। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে চারদিকে চলছে ব্যাপক তোড়জোর। ব্যাপক আয়োজনে বাঙালি নববর্ষের বর্নাঢ্য উচ্ছাসময় উৎসবের জন্য প্রস্তত হচ্ছে। বাংলা নববর্ষের আগে এখন সবখানেই সাজ সাজ আয়োজন। নববর্ষকে বরণ করে নিতে সবাই নিজেকে সাজিয়ে নেবেন সাদা-লাল রঙে/লাল-সাদা রঙের শাড়ি, হাতভরা কাঁচের চুড়ি, চোখে কাজল আর খোপায় গুজে দেওয়া ফুল-এই হলো বাঙালি মেয়েদের নববর্ষের সাজ। মেয়েদের পরণে লাল-সাদা শাড়ি, খোঁপায় বেলিফুলের মালা। রং বেরঙের পুতুল, মাটির খেলনা, মুখোশ, বাঁশি আর সাস বাতাসার ছড়াছড়ি। কোথাও নাগরদোলা, তারই পাশে হয়তো সার্কাস, লাঠি খেলা। চিরচেনা এ দৃশ্য আমাদের বৈশাখী উৎসবের। প্রতিবারের মতো এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রায় নতুন বছরকে বরণ করতে প্রস্থত বাঙ্গালীর উচাটন মন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে যেমন চলছে বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি তেমনি বিভিন্ন এলাকা প্রস্তুত হচ্ছে বৈশাখী মেলার জন্য। এখন রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতে বৈশাখী মেলার ধুম পড়ে যায় নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে। বরাবরের মতোই এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে চলবে নববর্ষের উৎসব। চারুকলা থেকেই সকাল সকাল বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা নতুন বছর প্রত্যেক বাঙালির মনে অনাবিল আনন্দ আর সুখের বার্তা বয়ে আনুক, এমন প্রত্যাশা আর দেশের মঙ্গল কামনায় এ শোভাযাত্রার আয়োজন। খুব ভোর থেকে রমনার বটমুলে চলবে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। পহেলা বৈশাখে জরাজীর্ণ, পুরাতনকে ছেড়ে নতুনের আহ্বানে ভেসে যাবে সবাই। ব্যর্থতা, না পাওয়ার গ্লানি, দুঃখ শোক, বঞ্চনার ক্ষোভ দুঃখ সবই ভুলে আবার নতুন করে জীবনের পথ চলার প্রত্যয় নিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াবে নারী পুরুষ শিশু কিশোর তরুণ বয়স্ক সবাই। বৈশাখের রঙে নতুন চেতনায় সাজবে সবাই। বাঙালি যেন আকুল হয়ে প্রতীক্ষা করে বৈশাখী উৎসবের। কেননা আবহমানকাল থেকে বাঙালীর চিরন্তন সর্বজনীন পার্বণ বাংলা নববর্ষ। বাঙালি আর বাংলা নববর্ষ এক বিকল্পহীন অভিযাত্রা। এই সময়ে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আনন্দে উদ্বেল হয় নববর্ষের আহ্বানে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, কারুশিল্প, লোক সংস্কৃতির বর্ণচ্ছটা, নতুন রঙিন পোশাক, হলুদ ফুলের সাজসজ্জা এবং ভোরের আলোয় নববর্ষের সুর্যোদয় সবই উদযাপন করার আকাংখায় থাকে প্রতিটি মানুষ। এই সময়ে আমাদের ফ্যাশনভুবন আন্দোলিত হয় নতুন আনন্দে। পোশাকের আয়োজনে আসে নতুন সংযোজন। ডিজাইনে আসে নতুনত্ব। বৈশাখ মানেই লাল-সাদার চিরায়ত রূপ। আগেও নববর্ষের দিন নতুন শাড়ি পরার চল ছিল। উৎসবের নতুন পোশাক হিসেবে সবাই সবাই সাধারণত লাল পাড়ের সাদা শাড়ি বেছে নিত। এর পেছনেও কারণ ছিল পহেলা বৈশাখ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন একটি উৎসব। এই দিনে সবাই নতুন প্রাণের উচ্ছাসে ভেসে যেতে যেতে অনুভব করে বাঙালীত্বের অনাবিল বিচিত্র স্বাদ।
বৈশাখ মানেই ষোলো আনা বাঙালিয়ানা। তাই বৈশাখকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজে এখন সাজসাজ রব। ঐতিহ্য আর রঙের সংমিশ্রনে এসেছে নতুন নতুন ডিজাইন। দোকানে দোকানে ক্রেতার ভিড় চোখে পড়ার মত। পহেলা বৈশাখের ছোঁয়া লাগছে মানুষের পোশাকে, অন্দরে, খবার থেকে সবখানে। তারন্য এই বৈশাখে সেজে উঠবে রঙে রঙে। কিভাবে? পোশাকে ও ফ্যাশনে। গত কয়েক দিনে বাজার ঘুরে দেখা গেল এবার তরুনদের বৈশাখী পোশাকে দেখা যাবে নানা ডিজাইনের খেলা। বিশেজ্ঞরাও এমনটাই আভাষ দিলেন। সাদা লাল রঙের পাশাপাশি অন্যান্য রঙের পোশাকও এবার পরনে তরুন তরুনীরা। পোশাকের কাটছাঁটেও থাকবে বৈচিত্র। সূতি শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখের এত রঙিন পোশাকের আয়োজনের মধ্যে এতটুকু কমেনি সূতি শাড়ির আবেদন। বরং কপালে টিপ, চুলের বাঁধনে ফুলের বাহার আর হাত ভর্তি রঙিন চুড়ি-চিরায়ত বাঙালির চমৎকার এই সাজ পোশাক এদিন ছড়িয়ে দেয় ষোলো আনা বৈশাখীবার্তা। সবাই যেন নিজের মানের মাধুরীতে তুলে ধরেছে বৈশাখী আমেজ। এখন দোকানগুলোতে আনাগোনা বাড়ছে ক্রেতাদের। বিভিন্ন ধরনের পোশাক কিনছে মানুষ। নারীর সৌন্দর্যকে নববর্ষের উৎসবে নতুন রঙে রাঙাতে চলছে কতো অফার কতো আয়োজন। বাঙালির শ্রেষ্ঠ, বৃহৎ এবং সর্বোচ্চ অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান হলো বৈশাখের প্রথম দিনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করা। এ অনুষ্ঠানের আনন্দ এবং উচ্ছাস এখন আর গ্রামে গঞ্জে সীমাবদ্ধ নেই। বাতাসে কান পাতলেই যেন শোনা যাচ্ছে নতুন বছর পহেলা বৈশাখের আগমনী ধ্বনি। বাংলা বছরের প্রথম এই মাস বৈশাখের সারাটা সময় থাকে দেশজুড়ে আনন্দঘন পরিবেশ। সারাদেশে চলতে থাকে বৈশাখ বরণ উৎসব। বৈশাখ শুধু একটি মাসের নাম নয়, বৈশাখ আগমন মানে তীব্র এক মাতন সারাবেলা। নবোদ্যমে, নবোল্লাসে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে দীপ্ত অঙ্গীকার সবাইকে উজ্জীবিত করে এই দিনে।
বাঙালি হয়ে জন্ম নিয়ে বাংলায় কথা বলা, বাংলায় বেড়ে ওঠার কি যে আনন্দ কি যে মজা তা সবাই আমরা অনুভব করি। দেশের মাটি, দেশের সংস্কৃতি যেন আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। সংস্কৃতি মানেই সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে আর মহৎভাবে বাঁচা। আর প্রতিনিয়ত মরতে মরতে বেঁচে থাকাটার নামই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতিতে বাংলা ও বাঙালির প্রতিটি বৈশাখেরই মৃত্যু হচ্ছে। এ মৃত্যু দৈহিক নয়। আতিœক ও মানসিক। অসুন্দরের উপসনা করে, অকল্যানের হাত ধরে বেঁচে থাকাটাই অপসংস্কৃতি। এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে চলছে অপসংস্কৃতির প্রচণ্ড দাপট লোভ লালসা, ষড়যন্ত্র, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, দূর্নীতি, সন্ত্রাস, অপরাজনীতি আমাদের চিরন্তন বাঙালীয়ানাকে ম্লান করে দিচ্ছে। আমাদের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, আবেগ উচ্ছাস সব কিছুতেই এখন বিদেশী সংস্কৃতির ছাপ সুষ্পষ্ট। বৈশাখ এলেই আমরা সবাই একদিনের জন্য যথার্থ বাঙালি হতে নানা কসরত করি। যা অনেক সময় হাস্যকর প্রহসন মনে হয়। শুধুমাত্র লোক দেখানো পান্তা ইলিশ উৎসবের আয়োজন রমনার বটমূলে ঘুরে বেড়ানোর কোন তাৎপর্য থাকে না তখন। শুধুমাত্র একটি দিনের জন্য বাঙালি সাজার প্রহসন না করে সারা বছরের জন্য বাঙালি হওয়ার শপথ নিতে হবে সবাইকে।
আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে হবে আমরণ। সারা বছর জুড়েই আমরা বাঙালি থাকতে চাই। পোশাক আশাকে, চিন্তা চেতনায় মননশীলতায় বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে গুরুত্ব দিতে সবাইকে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। আসুন, এবারের পহেলা বৈশাখে নববর্ষের আনন্দ উৎসবে হৃদয়ের গভীর থেকে আত্নোপলদ্ধির চেষ্টা করি যে আমরা সবাই প্রত্যেকে খাঁটি বাঙালি। আমাদের বৈশাখী উৎসবে বিনোদনে আর উদযাপনে স্বদেশীয় বিশ্বাস, প্রথা ও চেতনাকে যুক্ত করতে যত্নবান হই। যারা অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে স্বদেশীয় আর স্বজাতীয়, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে তৎপর তাদের প্রতিরোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এখনই। বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসব আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের দিন বসন্ত। আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না। সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা এখন হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছরই ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ। স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচার, রমনার বটমূল থেকে পুরো ঢাকা হয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে গ্রামে পালন করা হয়। শুধু গ্রাম নয়, শহর-উপশহর রাজধানী ঢাকারও বিভিন্ন অলিগলিতে বসে বৈশাখী মেলা। পান্তা-ইলিশ, বাঁশি, ঢাক-ঢোলের বাজনায় আর বৈশাখী শোভাযাত্রায় পূর্ণতা পাচেছ বাঙালির এ উৎসবমুখরতা।







