
বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোয় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে কাল। চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন ব্যাবসায়ীরা। লালদিয়া এলাকায় দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড বন্দর প্রকল্প, যা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার নির্মাণকাজ কাল শুরু হচ্ছে। উদ্যোগ নেওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর অবশেষে প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে।লালদিয়া হবে বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত প্রথম জ্বালানি সাশ্রয়ী, স্বয়ংক্রিয় গ্রিন পোর্ট। ডিজেলের পরিবর্তে এখানে ব্যবহার হবে সৌর বিদ্যুৎ বা হাইব্রিড সিস্টেম।
কাল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী,এমপি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম,এমপি।পতেঙ্গায় প্রকল্প এলাকায় এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।কর্ণফুলী নদীর তীরে রিমোটলি চালিত ক্রেনসহ পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন টার্মিনাল’ হিসেবে এটি গড়ে তোলা হবে।
৫৫ কোটি বা ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগে (FDI) এটি বাংলাদেশের প্রথম সম্পূর্ণ বৈদেশিক মালিকানাধীন বা যৌথ উদ্যোগের কন্টেইনার টার্মিনাল। ডেনমার্কের সহায়তায় এপিএম টার্মিনালস (APM Terminals) এটি নির্মাণ ও পরিচালনা করবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে গতি আনা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়া চরে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ওঠানামার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি বড় জাহাজ পরিচালনার সুযোগও তৈরি হবে। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ টার্মিনাল দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছে সরকার। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আরও দক্ষ ও গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস খাতের সক্ষমতাও বাড়বে।
ডেনমার্কের সহযোগিতায় নির্মিতব্য টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কনটেইনার পরিবহন ও হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে জানিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, লালদিয়া টার্মিনালের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কর্ণফুলী টানেল এবং আউটার রিং রোডের সরাসরি যোগাযোগ থাকায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে দ্রুত পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা হবে ৮ লাখ টিইইউ। থাকবে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি। সর্বোচ্চ ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে। এ ছাড়া সাতটি শিপ-টু-শোর ক্রেন এবং ৩২টি বৈদ্যুতিক রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের জন্য মোট ৪৯ দশমিক ১৫ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্লক-সি-এর ৩২ একরে মূল টার্মিনাল, ব্লক-বি-এর প্রায় ৭ দশমিক ১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ব্লক-এ-এর প্রায় ১০ একরে ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা তৈরি করা হবে।
প্রকল্পটির জন্য বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যে ২০২১ সালের ৩০ জুন একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালের ২১ মে লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয় এপিএম টার্মিনালস। একই বছরের ২৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দেয়।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম বাংলাদেশ-ডেনমার্ক পিপিপি যৌথ প্ল্যাটফর্মের বৈঠকে প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে কনসেশন চুক্তি সই হয় এবং প্রতিষ্ঠানটিকে কাজের অনুমতিপত্র দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত ২২ এপ্রিল প্রকল্পের জায়গা এপিএম টার্মিনালসের কাছে হস্তান্তর করে। এরই মধ্যে প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তিটির মেয়াদ মোট ৩৩ বছর। এর মধ্যে প্রথম তিন বছর নির্মাণ এবং পরবর্তী ৩০ বছর টার্মিনাল পরিচালনার জন্য নির্ধারিত। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরবর্তীতে আরও ১৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ও কনটেইনারের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ পরিচালনায় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ওই অর্থবছরে বন্দরে ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউ কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮ লাখ ২৭ হাজার ৮২৬ টন কার্গো এবং ৪ হাজার ৩৩৬টি জাহাজ পরিচালনা করা হয়। আগের অর্থবছরের তুলনায় কনটেইনার পরিচালনা বেড়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ, কার্গো ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং জাহাজ ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল, নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে কনটেইনার ওঠানামার কাজ চলছে। এর মধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো দেশের কোনো বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়।
নতুন লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।
দেশের বন্দর ও নৌপরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প এ ধারাবাহিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন অ্যান্ড লজিস্টিকস আজমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ইকোনমিতে নিশ্চিতভাবেই অনেক বড় ধরনের ভ্যালু অ্যাড করবে। কারণ এটা শুধু টার্মিনালই হবে না, এর সঙ্গে টেকনোলজিও আমাদের দেশে আসবে, নতুন প্রসিজিয়ার আমাদের মধ্যে আসবে। এর কারণে আমাদের এখানে হিউম্যান রিসোর্সের যে একটা ডেভেলপমেন্ট, সেটা হবে, এমপ্লয়মেন্ট তৈরি হবে।’তিনি বলেন, রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো যদি ঠিকভাবে মনিটর করে টার্মিনালটা সুন্দরভাবে পরিচালনা করে, তাহলে আশা করি সেটা আমাদের জন্য একটা ভালো দিক বয়ে আনবে।








