
রক্তে লাল হয়ে আছে মহাসড়ক। দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে একটি মাইক্রোবাস। চারদিকে মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন এক নারী। আর কয়েক হাত দূরে দুটি শিশু বুকফাটা কান্নায় মাকে খুঁজছে। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক, কণ্ঠে অসহায় আর্তনাদ। অথচ এত মানুষের উপস্থিতিতেও যেন তারা বড় একা, বড় অসহায়!
দৃশ্যটি আজও আমার চোখে ভাসে। কানে বাজে সেই শিশু দুটির কান্না। মনে পড়ে রক্তাক্ত নারীটির অসহায়ত্ব আর দুর্ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের নির্বাক মুখগুলো। সময় পেরিয়েছে তিন দশকেরও বেশি, কিন্তু সেই স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। সেদিন বুঝিনি, জীবনের একটি মুহূর্ত কীভাবে একজন মানুষের ভবিষ্যৎ পথচলার প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। জানতাম না, সেই রক্তমাখা দুপুরই একদিন আমাকে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করবে।
দিনটি ছিল ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর, শুক্রবার। আমি তখন কিশোর। শিকলবাহা থেকে চন্দনাইশ যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাসিমপুর এলাকায় হঠাৎ এক বিকট শব্দে থমকে গিয়েছিল চারপাশ। ছুটে গিয়ে দেখি, ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এক নারী। পাশে দুটি শিশু মায়ের জন্য কাঁদছে। সেই কান্না শুধু একটি দুর্ঘটনাস্থলের শোক ছিল না; আমার কিশোর হৃদয়ে তা হয়ে উঠেছিল মানবতার এক গভীর আর্তনাদ।
সেদিনের সেই নারী ছিলেন জাহানারা কাঞ্চন- জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী। তাঁর মৃত্যু একটি পরিবারকে শোকের অতল গহ্বরে ঠেলে দিয়েছিল। ভেঙে দিয়েছিল দুটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন। আর সেই ব্যক্তিগত শোক থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর বেদনা কোনো শব্দে মাপা যায় না। যে মানুষটির সঙ্গে ছিল জীবনের স্বপ্ন, সংসারের হাসি আর ভবিষ্যতের অসংখ্য পরিকল্পনা, তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া একজন মানুষের পৃথিবীকে মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে। ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনেও সেই নির্মম বাস্তবতা নেমে এসেছিল।
কিন্তু তিনি শোকের কাছে হার মানেননি। ব্যক্তিগত বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তর করে মানুষের জীবন রক্ষার সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তাঁর সেই দীর্ঘ পথচলার নাম- ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)।
চলচ্চিত্রের পর্দায় দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত ইলিয়াস কাঞ্চন বাস্তব জীবনে হয়ে উঠেছেন সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে সোচ্চার এক সংগ্রামী মানুষ। তাঁর আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু সব সময় নিয়তির লিখন নয়। দায়িত্বশীল আচরণ, ট্রাফিক আইন মেনে চলা, দক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
ইলিয়াস কাঞ্চনের সংগ্রামের প্রতি আমার শ্রদ্ধা শুধু একজন সংগঠকের প্রতি শ্রদ্ধা নয়; এটি এমন একজন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, যিনি নিজের জীবনের গভীরতম ক্ষতকে অন্য মানুষের জীবন রক্ষার প্রেরণায় পরিণত করেছেন।
১৯৯৩ সালের সেই দুর্ঘটনা আমার জীবনবোধে গভীর ছাপ ফেলেছে। সেই স্মৃতি বুকে ধারণ করেই যুক্ত হয়েছি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে। হয়েছি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নিসচার আজীবন সদস্য। পেয়েছি ‘সড়ক যোদ্ধা’ সম্মাননা ও ভারতের ‘পথ বন্ধু’ সম্মাননা। দেশে-বিদেশে আরও পেয়েছি বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতি। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।
একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবেও প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার খবর সংগ্রহ করি, দুর্ঘটনাস্থলের দৃশ্য ধারণ করি, সংবাদ তৈরি করি। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন, রক্তাক্ত সড়ক, স্বজনদের আহাজারি। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যের আড়ালে যে একটি পরিবার, কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন আর দীর্ঘদিনের কান্না লুকিয়ে থাকে, তা ভাবলেই বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে।
অন্য অনেক দুর্ঘটনা আমার পেশাগত দায়িত্বের অংশ হলেও ১৯৯৩ সালের সেই ঘটনাটি আমার কাছে কখনোই কেবল একটি সংবাদ হয়ে ওঠেনি। সেটি আমার জীবনের অংশ, আমার বিবেকের অংশ। আজও কোনো দুর্ঘটনাস্থলে অসহায় মানুষের মুখ দেখলে মনে পড়ে সেই দুটি শিশুর কথা। মনে হয়, সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, সংবাদ পৌঁছানোর গতি বেড়েছে; কিন্তু দুর্ঘটনাস্থলে আহত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক দায়িত্ব কি আমরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি?
দুর্ঘটনার পর অনেক সময় দেখা যায়, আহত ব্যক্তিকে ঘিরে মানুষের ভিড় জমেছে। অনেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন অথচ সেই সংকটময় মুহূর্তে প্রয়োজন দ্রুত সহায়তা, জরুরি সেবার ব্যবস্থা এবং আহত ব্যক্তিকে নিরাপদে চিকিৎসার আওতায় নেওয়া।
মানবিকতা শুধু অন্যের কষ্ট দেখে ব্যথিত হওয়ার নাম নয়; বিপদের মুহূর্তে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোর নামই মানবিকতা। দুর্ঘটনাস্থলে অযথা ভিড় না করে জরুরি সেবার পথ সুগম করা, দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা এবং প্রশিক্ষণ অনুযায়ী প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া জরুরি। গুরুতর আঘাতের আশঙ্কা থাকলে প্রশিক্ষিত সহায়তা ছাড়া আহত ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনে নাড়াচাড়া করা উচিত নয়।
কোনো মানুষ শুধু সময়মতো সহায়তা না পাওয়ার কারণে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বেন- এমন পরিস্থিতি আমরা চাই না। দুর্ঘটনার শিকার মানুষটি আমার স্বজন না হলেও তিনি কারও বাবা, মা, সন্তান, ভাই কিংবা বোন। তাঁর জন্য কেউ হয়তো হাসপাতালের দরজায় অপেক্ষা করছেন। কেউ হয়তো প্রিয়জনের ফেরার আশায় ঘরের দরজা খোলা রেখেছেন। এই উপলব্ধিই আমাদের মানুষ হিসেবে দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।
২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। দিনটি আমার কাছে শুধু একটি দিবস নয়; এটি স্মৃতি, শোক, আত্মোপলব্ধি এবং নতুন করে অঙ্গীকার করার দিন। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে শুধু শোক প্রকাশ কিংবা সচেতনতামূলক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ এবং সবার দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। চালক, যাত্রী, পথচারী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। চালকের বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, অদক্ষভাবে গাড়ি চালানো, যানবাহনের ত্রুটি এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মোটরসাইকেল চালানোর সময় মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধা, অতিরিক্ত গতি পরিহার, গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার না করা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ ফুটপাত, পথচারী পারাপারের উপযুক্ত ব্যবস্থা, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একজন চালকের সামান্য অসতর্কতা একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না হয়ে উঠতে পারে। আবার একজন চালকের দায়িত্বশীল আচরণ বাঁচিয়ে দিতে পারে বহু প্রাণ। তাই সড়কে চলাচলের প্রতিটি মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের জীবনের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
আজও নিজের কাছে প্রশ্ন করি- সেদিনের সেই দুটি শিশুর কান্না কি আমরা সত্যিই শুনতে পেয়েছি? সড়কে প্রতিদিন প্রাণহানির খবর কি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়? নাকি কিছু সময়ের শোক ও আলোচনা শেষে আমরা আবারও ভুলে যাই সবকিছু?
আমি চাই, আর কোনো শিশুকে যেন সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের জন্য এভাবে কাঁদতে না হয়। কোনো পরিবারকে যেন একটি দুর্ঘটনায় প্রিয়জন হারিয়ে সারা জীবন শোকের ভার বহন করতে না হয়। কোনো আহত মানুষকে যেন অসহায়ভাবে পড়ে থেকে সাহায্যের অপেক্ষা করতে না হয়।
ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘ সংগ্রাম আমাদের শিখিয়েছে, ব্যক্তিগত শোকও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হলে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আর আমার জীবনের সেই রক্তমাখা দুপুর শিখিয়েছে, মানুষের কষ্ট দেখে শুধু ব্যথিত হওয়া যথেষ্ট নয়- সেই কষ্ট কমাতে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করাও জরুরি।
২২ অক্টোবর এলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাসিমপুরের সেই মহাসড়ক, রক্তাক্ত এক নারী আর মাকে খুঁজতে থাকা দুটি শিশু। সেই দৃশ্য আমাকে আজও তাড়া করে ফেরে। সেই স্মৃতির কাছে দাঁড়িয়ে আমার একটাই প্রত্যাশা- আমরা যেন শুধু দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ না করি, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেষ্ট হই; শুধু দর্শক হয়ে না থাকি, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াই।
একদিন হয়তো আমাদের সড়কগুলো আরও নিরাপদ হবে। চালকেরা হবেন দায়িত্বশীল, পথচারীরা পাবেন নিরাপদে চলাচলের অধিকার, আর দুর্ঘটনায় আহত মানুষ দ্রুত সহায়তা পাবেন। সেদিনই সার্থক হবে ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘ সংগ্রাম। সেদিনই আমার কিশোর বয়সের সেই রক্তমাখা স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারব- আমরা শিখেছি, আমরা বদলেছি, আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি।
কারণ নিরাপদ সড়ক শুধু নির্বিঘ্নে চলাচলের নিশ্চয়তা নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার প্রথম শর্ত- মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা।
লেখক: শফিক আহমেদ সাজিব
গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি।







