
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের ঢাকা-খাগড়াছড়ি সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য কাটা হচ্ছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো বটগাছ।বটগাছটির অবস্হানের উপর ভিত্তি করে জায়গাটির নাম চেগাইয়া বটগাছ নামে পরিচিত। স্থানীয়দের কাছে গাছটি শুধু একটি বৃক্ষ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ইতিহাস,স্মৃতি ও এলাকার পরিচিতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাছটি কাটা পড়ায় সোস্যাল মিডিয়ায় অনেকে ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ।
ঢাকা–খাগড়াছড়ি সড়কের পূর্ব সোনাই ফুলছড়ি মসজিদের সামনে অবস্থিত এই বটগাছের নামেই পরিচিতি পেয়েছে এলাকাটি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটি ছিল স্থানীয়দের কাছে ঐতিহ্যের এক নীরব স্বাক্ষী। কিন্তু সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কারণে সেই স্মৃতিচিহ্ন এখন বিলুপ্তির পথে।গাছ কাটার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শামসুদ্দীন নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘জনগুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম ঢাকা-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য বহুবর্ষী এই গাছটি কাটতে হচ্ছে। মানুষের প্রয়োজনে নতুন কিছু করতে গিয়ে অনেক সময় পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা কিংবা নিদর্শন হারিয়ে যায়। তবে প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের সময় চাইলে গাছটি রক্ষা করেও পরিকল্পনা করা যেত। গাছটি টিকিয়ে রাখা গেলে ভালো হতো। কারণ, এই গাছের নামেই স্থানটির নামকরণ হয়েছে। গাছটি না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্থানটির এমন নামকরণের ইতিহাস জানা ও বোঝা কঠিন হয়ে পড়বে।’
গাছটিকে ঘিরে বহু স্মৃতি ও ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে উল্লেখ করে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সদস্য আব্দুল মালেক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এই বটগাছকে ঘিরে বহু ইতিহাস ও স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। গাছটি এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। এটি কাটা পড়লে সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হারিয়ে যাবে।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আজ গাছটি পুরোপুরি কাটা হচ্ছে। শুরুতে গাছটি অক্ষত রেখেই সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে গাছটি না কাটলে সড়কটি সামনের মসজিদের পাশ ঘেঁষে নির্মাণ করতে হতো। এতে মসজিদটির ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় এলাকাবাসী গাছটি কাটার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও বটগাছটির পেছনে জায়গা রয়েছে। চাইলে গাছটি অক্ষত রেখে পেছনের দিকে মাটি ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করা যেত।’
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (করেরহাট রেঞ্জ) মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘সড়কটির নির্মাণকাজ শুরুর আগে সড়কের পাশে থাকা প্রায় ২ হাজার ৮০০টি গাছ চিহ্নিত করা হয়েছে। চেগাইয়া বটগাছটিও ওই তালিকায় রয়েছে। এ গাছের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বন বিভাগকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অশোকা বিল্ডকন লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার সন্দীপ দে-এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন যেমন সময়ের দাবি, তেমনি পুরোনো বৃক্ষ ও স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। চেগাইয়া বটগাছের বাঁচিয়ে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খাগড়াছড়ির রামগড় স্থলবন্দর হয়ে ভারতে পণ্য রপ্তানির সময় কমিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে বারইয়ারহাট–হেঁয়াকো–রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বারইয়ারহাট থেকে ফটিকছড়ির হেঁয়াকো হয়ে খাগড়াছড়ির রামগড় পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করা হচ্ছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সড়কটির প্রশস্তকরণকাজ শুরু হয়। বিদ্যমান ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটি ৩৮ ফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ পায় ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অশোকা বিল্ডকন লিমিটেড।







