
বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যার মূল স্লোগান হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ।’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও সামাজিক ন্যায্যতার বিষয়গুলোকে সামনে রেখে ইশতেহারে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচারের নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনা করেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
দলীয় সূত্র জানায়, এই ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে বিএনপির ঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা’, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সমন্বয়ে।
ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষা খাত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার এবং আওয়ামী লীগ আমলের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্তকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া খতিব-ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানীর মতো জনমুখী বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নারী ও যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ধারণা অনুযায়ী ইশতেহারের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার বিপ্লব এবং ১৯৯০ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও উল্লেখযোগ্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রবর্তনের। মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, জটিল রোগে আধুনিক চিকিৎসা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় হেলথ ডেটাবেজ গড়ে তোলা হবে এবং বাংলাদেশকে স্বাস্থ্য পর্যটন সিটি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তরুণ ও যুবসমাজের জন্য আইটি পার্কে অফিস সুবিধা, দেশজুড়ে ফ্রি ওয়াইফাই জোন, আউটসোর্সিং ও এসএমই শিল্পে সহজ শর্তে ঋণ, আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন ও আলিবাবার সঙ্গে সংযোগ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও স্টার্ট-আপ ফান্ডসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা ও জব ম্যাচিং সেবা প্রদান করা হবে এবং তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে, ইংরেজি, বাংলা ও তৃতীয় বিদেশি ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে, ঝরে পড়া রোধে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস প্রদান করা হবে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত রাখা হবে এবং নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সুবিধা নিশ্চিত করতে স্কুলে ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করা হবে। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো আকর্ষণীয় করা হবে এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। পরিবেশ রক্ষার জন্য আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার ক্ষেত্রে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানসহ স্বৈরাচারী আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, গুম ও হত্যাকাণ্ডের অবিলম্বে তদন্ত এবং পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের অনিয়ম তদন্তের জন্য বিশেষ কমিশন গঠন করা হবে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিতামূলক করতে উন্নয়ন জনসভা আয়োজন করা হবে এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক ও সক্ষম রাখতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কার্যকর করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করা হবে এবং টেকসই জ্বালানি উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা হবে। অর্থনীতি খাতে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশের প্রতিশ্রুতি, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও ই-কমার্স সম্প্রসারণ এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি করা হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতি অনুসরণ করা হবে। মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য ধর্মের পুরোহিতদের মাসিক সম্মানী প্রদানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর গঠন করা হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রধান সড়কে পৃথক লেন, রাইড শেয়ারিং-এ সাইকেল সেবা এবং গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন করা হবে। বেসরকারি কর্মীদের জন্য কার্যকর পেনশন ফান্ড গঠন করা হবে এবং কৃষি ও নৌপথ উন্নয়নের জন্য ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখনন করা হবে।
বিএনপির নেতৃবৃন্দ ডা. মওদুদ আলমগীর, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও ডা. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, দেশ গড়ার পরিকল্পনাই বিএনপির ইশতেহারের মূল ভিত্তি এবং সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক সব পরিকল্পনা এতে অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি রোধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করা হবে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি ছিলেন। সেই সময় দলটির ইশতেহার প্রকাশ হয়েছিল গুলশান লেকশোর হোটেলে। এবারের ইশতেহারের মূল স্লোগান হলো ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা—সবার আগে বাংলাদেশ।’







