ড. ইউনূসের বিদায় ও তারেক রহমানের অভিষেক

ড. ইউনূসের বিদায় ও তারেক রহমানের অভিষেক

দীর্ঘ ১৮ মাসের এক ঐতিহাসিক ও চ্যালেঞ্জিং রূপান্তরকাল শেষে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করেছেন।

সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক আবেগঘন বিদায়ী ভাষণে তিনি এই ঘোষণা দেন। মূলত গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করতেই তাঁর এই পদত্যাগ।

মঙ্গলবার বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ড. ইউনূসের এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। ভাষণে তিনি বলেন, আজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নিচ্ছে। তবে গত দেড় বছরে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকার চর্চার যে নব দিগন্ত সূচিত হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই থমকে না যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এক কঠিন সময় পার করেছে। দেশের ভেঙে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার এবং একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম সংসদ নির্বাচনে সেই লক্ষ্যেরই প্রতিফলন ঘটেছে।

নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অন্তত ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং তারা আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল এই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সাথে পরিচালিত বলে প্রশংসা করেছে, যা আগামী দিনে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।

আজকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর গত দুই মাস আগে দেশে ফেরেন। তাঁর এই বিপুল বিজয়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।

নির্বাচনে বিজয়ের পর তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ছাত্র-জনতার সেই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা এবং একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কেবল জনপ্রতিনিধিই নির্বাচিত হয়নি, বরং ভোটাররা একটি জাতীয় গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ নামক একটি যুগান্তকারী সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের নামানুসারে এই সনদের নামকরণ করা হয়েছে। এই সনদের মূল প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না এবং উচ্চকক্ষসহ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন করা হবে।

এ ছাড়া ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। ড. ইউনূস তাঁর ভাষণে এই সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আমরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণ করেছি এবং সংস্কারের পথ প্রশস্ত করেছি। তবে এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো কার্যকর করতে হলে নতুন নির্বাচিত সংসদকে তা অনুমোদন করতে হবে।

১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি, তবে তাদের জন্য পথটি খুব একটা মসৃণ হবে না। ঢাকা ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি আল জাজিরাকে বলেন, এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখা। ২০২৪ এর অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন এবং সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা নতুন সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা হবে।

ড. ইউনূস তাঁর বিদায়ী ভাষণে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ভোটাররা যেভাবে ভয়হীন চিত্তে ভোট দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ এখন আর কোনো নতজানু রাষ্ট্র নয়, বরং পারস্পরিক মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে।

আজ মঙ্গলবার যখন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন, তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত ৩০ বছরের নারী প্রধানমন্ত্রী অধ্যায়ের অবসান ঘটবে এবং দীর্ঘ সময় পর একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন। এই পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা গুণগত পরিবর্তন আনে, তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে কোটি মানুষ। ড. ইউনূস ৮৫ বছর বয়সে এসে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন শেষে আবার ফিরে যাচ্ছেন তাঁর আপন ভুবনে। তাঁর হাতে সূচিত হওয়া গণতন্ত্রের এই প্রদীপ নতুন সরকার কতটা সযত্নে এগিয়ে নেয়, তাই এখন দেখার বিষয়। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email