জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন বার্তা

জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন বার্তা

সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ও নেতৃত্বদানকারীদের সুরক্ষা প্রদান করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, র‍্যাবের ভবিষ্যৎ, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের বীরদের নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে চলা নানা গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। আমাদের সরকার ‘জুলাই সনদ’-এর মূলনীতির আলোকেই পরিচালিত হচ্ছে।

পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে অন্যান্য মন্ত্রীদের বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কৌশলী অবস্থান নেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এলজিআরডি মন্ত্রী এই বিষয়ে কী বলেছেন তা তার জানা নেই, তবে তিনি নিজে এ জাতীয় কোনো মন্তব্য করেননি। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো অভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সেই লক্ষ্যেই সম্মিলিতভাবে কাজ করা।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মাঠে নামানো হয়েছিল সশস্ত্র বাহিনীকে। এই বাহিনী কতদিন মাঠে থাকবে, তা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনী নিজেই চিরকাল সিভিল প্রশাসনে কাজ করতে আগ্রহী নয়। তারা তাদের পেশাগত দায়িত্বে ফিরে যেতে চায়।

দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী বর্তমানে পুলিশকে সহায়তা দিচ্ছে এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত হবে নাকি এর নাম পরিবর্তন হবে এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বাস্তবসম্মত ও কৌশলী জবাব দেন। তিনি বলেন, র‍্যাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও জননিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

পাশাপাশি, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে তিনি জানান। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অবৈধ অস্ত্রের মালিকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে সরকার।

আজ সচিবালয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একাধিক স্পর্শকাতর ইস্যু উঠে আসে।

সীমান্ত হত্যা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার বিষয়ে কড়া প্রতিবাদ এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। ভারতীয় পক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

ভিসা প্রক্রিয়া: ভারতীয় ভিসা প্রাপ্তিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে ধাপে ধাপে টুরিস্ট ভিসা দেওয়ার পরিমাণ বাড়ানো হবে বলে হাইকমিশনার আশ্বাস দিয়েছেন।

পারস্পরিক স্বার্থ: দুই দেশের নিরাপত্তা ইস্যু এবং যাতায়াত সহজ করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আসন্ন জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ ও ১টি আদেশ উত্থাপন করা হবে। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এই অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে—কোনটি স্থায়ী আইনে রূপ নেবে, কোনটি আংশিক সংশোধিত হবে এবং কোনটি বাতিল হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আধুনিকায়ন নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক অগ্নিদুর্ঘটনার পর সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার কথা ভাবছে সরকার। প্রতিটি উপজেলায় ফায়ার সার্ভিসের অফিস নিশ্চিত করা হবে। এই দপ্তরে স্বচ্ছতার সাথে নতুন জনবল নিয়োগের ঘোষণাও দেন তিনি, যেখানে অতীতের দুর্নীতির চিহ্ন মুছে ফেলার অঙ্গীকার করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আজকের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একদিকে যেমন জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাস্তবসম্মত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং জননিরাপত্তায় সেনাবাহিনীকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email