ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন দৃষ্টান্ত

ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন দৃষ্টান্ত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল এবং ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে নিজের ব্যক্তিগত প্রচারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এবং ভিভিআইপি প্রটোকল সংস্কৃতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি এক নতুন ‘জনবান্ধব’ শাসন ব্যবস্থার সূচনা করেছেন।

মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি।

আজ সকালে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয় রাজধানীর হাতিরঝিল ও গুলশান এলাকা। প্রধানমন্ত্রী যখন সচিবালয়ে তাঁর দাপ্তরিক কাজে যাচ্ছিলেন, তখন হাতিরঝিলের পুলিশ প্লাজার সামনে তাঁর ছবি সম্বলিত একটি বিশাল অভিনন্দন ব্যানার তাঁর নজরে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি গাড়ি থামিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ব্যানারটি সরিয়ে ফেলা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বা সরকারি জায়গায় তাঁর ব্যক্তিগত স্তুতি বা অভিনন্দনের কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু ব্যানার নয়, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে থাকা এলইডি স্ক্রিন এবং ডিজিটাল বিলবোর্ড থেকেও তাঁর ছবি ও অভিনন্দন বার্তা দ্রুত সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগেও বিজয় সরণি এলাকায় একই ধরনের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন দেখে তিনি তা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের প্রচলিত ‘ব্যানার-ফেস্টুন’ সংস্কৃতির মূলে এক বড় আঘাত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি চাটুকারিতা বন্ধ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে মনোনিবেশ করার একটি স্পষ্ট সংকেত।

ঢাকার চিরচেনা যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই নিজের গতিরোধক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তাঁর চলাচলের জন্য সাধারণ মানুষের চলাচল স্তব্ধ করা যাবে না। আজ উপস্থাপিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গড় গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগে ঢাকায় যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৪.৫ কিলোমিটার যা মূলত একজন সুস্থ মানুষের হাঁটার গতির সমান। কিন্তু গত ১৪ দিনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই গতি বৃদ্ধি পেয়ে ৫.৩ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে।

অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানান, “প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা (VVIP) এখন আর প্রটোকলের দোহাই দিয়ে রাস্তা বন্ধ রাখছেন না। প্রধানমন্ত্রী নিজে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলছেন। তাঁকে অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতি এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও এখন ট্রাফিক আইন মেনে চলায় সাধারণ যানবাহন চলাচলে আগের মতো বিঘ্ন ঘটছে না।’

এটি প্রমাণ করে যে, ওপরমহল থেকে আইন মানার সংস্কৃতি শুরু হলে তার ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি তৃণমূলের মানুষের ওপর পড়ে। মাত্র ০.৮ কিলোমিটার গতি বৃদ্ধি শুনতে কম মনে হলেও, ঢাকার মতো মেগাসিটিতে এটি লাখ লাখ কর্মঘণ্টা সাশ্রয় করছে।

আজ সকাল ৯টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে তাঁর কার্যালয়ে পৌঁছান। সেখানে তিনি রুটিন মাফিক দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল জিয়াউল হক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি কোস্ট গার্ডকে নিম্নলিখিত নির্দেশনাসমূহ প্রদান করেন।

বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুতা ও ডাকাতি রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। মাদক এবং মানব পাচার রোধে টহল জোরদার করা। মৎস্য সম্পদ রক্ষায় ইলিশ প্রজনন মৌসুমে কঠোর নজরদারি এবং সাধারণ জেলেদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির সুফল পেতে হলে আমাদের সমুদ্রসীমাকে নিরাপদ রাখা অপরিহার্য।

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দ্রব্যমূল্য। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে মোটা চালের দাম সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই প্রধানমন্ত্রী বিচলিত হন। সচিবালয়ে অবস্থানকালেই তিনি সংশ্লিষ্ট খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জরুরি ভিত্তিতে বাজার তদারকির নির্দেশ দেন।

আতিকুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে তিনি জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নিয়মিত বাজার মনিটরিং করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। ‘প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, গরিবের অন্ন নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলবে, তাদের পরিচয় যাই হোক, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না,‘বলেন অতিরিক্ত প্রেস সচিব।

৩ মার্চ ২০২৬-এর এই ঘটনাপ্রবাহ কেবল একটি দিনের খবর নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কারের একটি জলজ্যান্ত দলিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে নিজের ছবি সম্বলিত ব্যানার নামিয়ে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ট্রাফিক সিগন্যালে বসে থাকছেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা।

প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগের তিনটি প্রধান দিক রয়েছে। ব্যানার-বিলবোর্ডের পেছনে অপচয় বন্ধ করে কাজের দিকে মনোযোগ দেওয়া। রাষ্ট্রের প্রধান যখন ট্রাফিক আইন মানেন, তখন সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সচিবালয়ে সময়মতো উপস্থিত হওয়া এবং প্রতিটি খাতের (যেমন চালের দাম বা কোস্ট গার্ডের কার্যক্রম) সরাসরি তদারকি করা।

ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গতি ৫.৩ কিলোমিটারে পৌঁছানো হয়তো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, কিন্তু এটি একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে আগামী দিনগুলোতে ঢাকা হবে একটি স্মার্ট এবং গতিশীল শহর, যেখানে ক্ষমতার দাপট নয় বরং আইনের শাসনই হবে শেষ কথা।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email