আওয়ামী প্রতিহিংসার বলি ছিল চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘর

আওয়ামী প্রতিহিংসার বলি ছিল চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘর

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে জানতে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি শত শত দর্শনার্থী ভিড় করতো চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের প্রতিহিংসার বলি হয়েছিল চট্টগ্রাম জিয়া স্মুতি জাদুঘর। অবহেলা আর অযত্নে মলিন হয়ে পড়েছে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী এই জাদুঘর ভবনটি। দর্শনার্থী আগমনের দিক থেকে দেশের তৃতীয় স্থানে থাকা এই সরকারি জাদুঘরটিতে ২০০৬ সালের পর আর কোন বড়ধরনের সংস্কার কাজ হয়নি। ‘টেকনিক্যাল’ কারণ দেখিয়ে জাদুঘরটি সংস্কারে কোন বরাদ্দ না দেওয়ায় কিছু অংশে ফাটল দেওয়ার অজু হাতে এখন বন্ধ রয়েছে। সংস্কারের অভাবে দেয়াল ফেটে হা হয়ে আছে। খসে পড়েছে পলেস্তারা। বৃষ্টি হলেই ছাদ বেয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি। ভেঙে গেছে গ্যালারির বোর্ডগুলোও। এতে বিনষ্ট হওয়ার পথে ইতিহাসের স্মারক জিয়ার স্মৃতি।

ব্রিটিশ আমলে ১৯১৩ সালে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন পুরাতন সার্কিট হাউজ ভবনটি হয় জিয়া জাদুঘর। ৩৭ বছর আগে ১৯৮১ সালের ৩০ মে কালো রাতে এ ভবনে শাহাদাতবরণ করেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনানী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। অভিশপ্ত এ ভবনের শয়নকক্ষে ছোপ ছোপ রক্তে ভেজা কার্পেট, বুলেটে ঝাঝরা হয়ে যাওয়া দেয়ালের সেই ভয়াল বিভীষিকার চিহ্ন এখনও কাঁদায় জিয়াপ্রেমিক সাধারণ দর্শকদের। ভবনের প্রতিটি কক্ষে জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবনের অসংখ্য ঘটনাবহুল নিদর্শন স্থান পায়।

এখানে আরো রয়েছে ঐতিহাসিক এবং দুর্লভ অনেক ছবি ও দর্শনীয় বস্তু। সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, সার্কের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা স্থান পেয়েছে এ জাদুঘরে। একজন পরিপূর্ণ জিয়াকে জানতে এবং বুঝতে এই যাদুঘরে আসতেন দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ। অনেকে আসেন দৃষ্টিনন্দন ভবনটি দেখতে। তবে ভবনের ভেতরে থাকা মানুষটির বর্ণাঢ্য জীবনগাথা তাদেরও নাড়া দেয়।
কর্তৃপক্ষের অবহেলায় জাদুঘরটির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি গত ১৭ বছর। পুরো ভবনটি মলিন হয়ে গেছে। জিয়া স্মৃতি জাদুঘর লেখা স্মৃতি ফলকটিতে কি লেখা তা বোঝার উপায় নেই। খসে পড়েছে ভবনের আস্তর। দরজা-জানালায় ধুলোবালির আস্তরণ। পর্দার নিচে ঝুলছে মাকড়সার জাল। জাদুঘরের ভেতরের টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু আর নতুন সার্কিট হাউজের মাঝখানে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিনন্দন এ ভবনটির দৈন্যদশা খুবই বেমানান দেখাচ্ছে। এরপরও জাদুঘরটি বন্ধ থাকলেও প্রতিদিন শত শত দর্শর্নার্থীর এসে গেইট থেকে ফেরত যেতে দেখা যায়।
বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ঈদুল ফিতরের আগের দিন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর পর সাংস্কৃতিক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সহ অনেক মন্ত্রী এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল জাদুঘরে পরিদর্শন করেন। কিন্তু তারা কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। প্রশাসনে লুকিয়ে থাকা একটি আওয়ামী চক্র তাই এই জাদুগরটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য। তাই বর্তমান জাদুঘরের প্রশাসন বন্ধ রাখার পক্ষে জাদুঘর।
বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জিয়াউর রহমানকে ছোট করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল এই ফ্যাসিস্ট সরকার। বর্তমান প্রজন্ম ওই জাদুঘরে ঘুরে দেখলেই বাস্তব কে চিনবে জানবে। এইজন্য কেউ কেউ চাই জিয়া স্মৃতি জাদুঘরটি বন্ধ থাকুক।

১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণের স্মৃতি বিজড়িত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের নতুন একটি ভবন নির্মাণ করে দেন। বৃটিশ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত জিয়া স্মৃতি জাদুঘর ভবনটি এ অঞ্চলের মধ্যে দৃষ্টিনন্দন একটি ভবন হিসেবে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নজর কাড়তো। ভবনটিতে জিয়াউর রহমানের উপর প্রকাশিত বিভিন্ন বই নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি পাঠাগারও। সেখানে রয়েছে অভিজাত একটি অডিটোরিয়াম।

জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের ১৭ গ্যালারীতে প্রায় সহস্রাধিক বস্তুগত নিদর্শন রয়েছে।
এক নম্বর গ্যালারীতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা। বিশেষ করে তার সৈনিক জীবনের বিভিন্ন দিক সেখানে স্থান পেয়েছে। দ্বিতীয় গ্যালারীতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নানা নিদর্শন। কালুরঘাটের বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ ঘোষণার স্মৃতি বিজড়িত বেতারযন্ত্রসহ নানান সামগ্রী সেখানে স্থান পেয়েছে।

তৃতীয় গ্যালারী সেক্টর ভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের নানা কর্মকা- ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে আছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর কমান্ডার এবং বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্তদের প্রোট্রেট। চতুর্থ গ্যালারীতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে সংঘটিত ঐতিহাসিক যুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলগত রণপ্রস্তুতির ঘটনা ডিউরমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

গ্যালারি পাঁচে রয়েছে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারীতে একটি পোস্ট অফিস স্থাপনের নিদর্শন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তৎকালীন জেড ফোর্সের অধিনায়ক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মুক্ত অঞ্চল হিসেবে ওই এলাকায় একটি ডাকঘর স্থাপন করেন। গ্যালারি ছয়-এ জিয়াউর রহমানের সংগ্রামী সৈনিক জীবনের নানা চিত্র বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে স্থান পেয়েছে জিয়াউর রহমানের সামরিক পোশাক, ব্যাগ, টুপি, ছড়িসহ নানা সামগ্রী।

সাত নম্বর গ্যালারিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নে জিয়াউর রহমানর হাতে লিখা বিএনপির আদর্শ, উদ্দেশ্য সম্বলিত মেন্যুফেস্টু স্থান পেয়েছে। এছাড়া সেখানে আছে বিএনপির দলীয় পতাকা এবং মনোগ্রামের ছবি। আট নম্বর গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে জিয়াউর রহমানের বেশকিছু বিরল ছবি। নয় নম্বর গ্যালারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বঙ্গভবনে অফিসকরাকালীন দৃশ্য। যা ডিউরমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বঙ্গভবনে যে চেয়ার এবং টেবিলে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন সে চেয়ার টেবিলও এ গ্যালারিতে রাখা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড শুরু করেন জিয়াউর রহমান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বিষয় ভিত্তিক বাংলাদেশের কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে খাল খনন কর্মসূচি। দশ নম্বর গ্যালারিতে ডিউরমার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান নিজেই খাল কাটায় অংশ নেয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
দেশ গড়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মনোযোগী হন জিয়াউর রহমান। এর ধারাবাহিকতায় এ অঞ্চলের ৭টি দেশ নিয়ে গঠিত হয় সার্ক। এগার নম্বর গ্যালারিতে সার্কের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে রয়েছে সার্কভুক্ত ৭টি দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রোট্রেটসহ একটি ডিউরমা।

বার নম্বর গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের বিদেশ সফরের বেশকিছু দুর্লভ ছবি। এর পাশাপাশি সেখানে রাখা হয়েছে তাঁর নির্মম হত্যাকা-ের পর বিশ্ব প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত খবরাখবরের কাটিং। গ্যালারি তেরতে শোভা পাচ্ছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিদেশ সফরকালে বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের দেয়া উপহার সামগ্রী।

গ্যালারী চৌদ্দ এবং পনেরতেও বিভিন্ন উপহার সামগ্রীর পাশাপাশি বিদেশ সফর এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা-সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিদেশী সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের দুর্লভ অনেক ছবি। ষোল নম্বর গ্যালারিতে আসলেই দর্শকদের চোখ আটকে যাবে সেখানে রাখা একটি খাট তারপাশে রাখা ছোট্ট টেবিল এবং তার উপর একটি গ্লাসের দিকে।

শাহাদাতের পূর্বমুহূর্তে এ কক্ষেই রাত্রি যাপন করেছিলেন জিয়াউর রহমান। খাটের পাশে মেঝেতে রাখা কার্পেট এবং কক্ষ থেকে বের হওয়ার পথে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ এবং বুলেটে ঝাঝরা হয়ে যাওয়ার দৃশ্য জ্বলজ্বল করছে এখনও। ওই কক্ষেই ঘাতকের তপ্ত বুলেটে ঝাঝরা হয়ে যায় জিয়াউর রহমানের শরীর। শাহাদাত গ্যালারি হিসেবে পরিচিত এ গ্যালারি থেকে বের হলেই গ্যালারি নম্বর সতের। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের শাহাদাত বরণের পর জিয়াউর রহমানের লাশ গোপনে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে রাঙ্গুনিয়ার জিয়ানগরে দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হয়। পরে সেখান থেকে লাশ তুলে নিয়ে ঢাকায় তাকে দাফন করা হয়। রাঙ্গুনিয়ার প্রথম মাজার এবং ঢাকার মাজারের চিত্র ডিউরমার মাধ্যমে এ গ্যালারিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
জিয়া স্মৃতি জাদুঘরকে দ্রুত হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হবে: অর্থমন্ত্রী
চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক জিয়া স্মৃতি জাদুঘরকে দ্রুত হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলায় জাদুঘরটির অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তাই দ্রুত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই। স্থাপনাটির সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাঠামোগত সমস্যা বেড়েছে। এমনকি বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।শুক্রবার (২০ মার্চ ২০২৬) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সংলগ্ন জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন অর্থমন্ত্রী। পরিদর্শন শেষে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

সার্বিক বিষয়ে জানতে কথা হয় জাদুঘরের উপ-কিপার (রুটিন দায়িত্ব) অর্পিতা দাশ গুপ্তের সঙ্গে। তিনি বলেন, জাদুঘরের সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়গুলো নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। আশা করি ওনারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

এই জাদুঘরের আরেক সমস্যা লোকবলের সংকট। প্রতিষ্ঠানটিতে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪৩টি। বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩০ জন। তাদের মধ্যে দুজন আবার অস্থায়ী ভিত্তিতে। কিউরেটর, হিসাবরক্ষক, লাইব্রেরিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি। কর্মকর্তারা জানান, লোকবল সংকটে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একেকজনকে একের অধিক পদের কাজ করতে হচ্ছে।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email