স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণ

স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণ

ভোরের কুয়াশাভেজা আলো আর বসন্তের স্নিগ্ধ বাতাসে আজ মিশে আছে একাত্তরের বীরত্বগাথা। বাংলাদেশের ৫৪তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক মহাতীর্থ।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর সন্তানদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে বৃহস্পতিবার ভোরে স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। স্মৃতিসৌধের আকাশ-বাতাস যেন তখন গুমরে উঠছিল অমর শহীদদের স্মৃতিরভারে।

বৃহস্পতিবার সকাল ঠিক ৬টায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছান। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং তার ঠিক পরেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তারা স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল সশস্ত্র অভিবাদন (গার্ড অব অনার) প্রদান করে। বিউগলের করুণ সুর আর রাষ্ট্রীয় সালামের মধ্য দিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। বীর শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় এ সময় বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।

রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পুনরায় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একে একে জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। দিবসটির অন্যতম বিশেষ দিক ছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান-এর নেতৃত্বে একদল জ্যেষ্ঠ নেতা বীর শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে মহান স্বাধীনতার এই পবিত্র দিনে জাতীয় সংহতির এক অনন্য ছবি ফুটে ওঠে সাভারের এই ১০৮ ফুট উচ্চতার স্মৃতিসৌধের পাদদেশে।

রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পরপরই সকাল ৭টার দিকে স্মৃতিসৌধের ফটক উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের জন্য। মুহূর্তের মধ্যেই ৮৪ একরের বিশাল প্রাঙ্গণ রূপ নেয় জনসমুদ্রে। হাতে লাল-সবুজের পতাকা, কপালে জাতীয় পতাকার ফিতা আর হাতে বর্ণিল ফুলের স্তবক নিয়ে হাজির হন আবালবৃদ্ধবনিতা।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী সমিতি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে সারিবদ্ধভাবে শহীদ বেদিতে ফুল দেন।

শহীদ পরিবারের সদস্য ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারাও এসেছিলেন তাদের হারানো স্বজন ও সহযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাতে।

অভিভাবকদের সাথে আসা ছোট ছোট শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা প্রমাণ করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাধীনতার এই চেতনা বহমান।

সকাল বাড়ার সাথে সাথে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে মূল বেদি। রক্তরাঙা গোলাপ, গাঁদা আর রজনীগন্ধার ঘ্রাণে পুরো এলাকা এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।

স্বাধীনতা দিবসের এই বিশেষ আয়োজনকে ঘিরে সাভার ও সংলগ্ন এলাকায় ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র‍্যাব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পুরো এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রেখেছিলেন।

স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি ও শৃঙ্খলার ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়, যাতে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।

উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিকদের কণ্ঠে বারবার উচ্চারিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। বক্তারা বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছিলেন এবং ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এখনই।

স্মৃতিসৌধের এই ফুলেল শ্রদ্ধা কেবল একটি বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি জাতির পুনর্জাগরণের দিন। ৫৪ বছরের এই পথচলায় অর্জিত সাফল্য আর আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাভারের এই কংক্রিট ও ইটের মিনারগুলো আজ যেন নতুন করে প্রেরণা দিচ্ছে পুরো জাতিকে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email