চট্টগ্রামে বর্ষাকালে পাহাড় ধসের আশঙ্কা এবং মৃত্যুর মিছিল নিয়মিত ঘটনা

চট্টগ্রামে বর্ষাকালে পাহাড় ধসের আশঙ্কা এবং মৃত্যুর মিছিল নিয়মিত ঘটনা

১১ জুন চট্টগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী পাহাড় ধসের ভয়াবহ দিন। ২০০৭ সালের এই দিনে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে অন্তত ১২৭ জন প্রাণ হারান ।পাহাড় ধ্বংসের এই প্রবণতা শুধু পরিবেশবাদীদের উদ্বেগের কারণ নয়, এটি এখন সরকারি সংস্থা ও প্রশাসনেরও বড় মাথাব্যথা।প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড় থেকে অবৈধ বসতি সরাতে প্রশাসনের তোড়জোড় শুরু হয়। পাহাড়ের অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করার জন্য কোমর বেঁধে মাঠে নামে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু পাহাড় দখল, কর্তন কিংবা বসতি নির্মাণ কোনটিও কমছে না। সময়ের ব্যবধানে পাহাড়ে অবৈধ বসতি দিন দিন বাড়ছে। তাছাড়া প্রতিবছর ঘটে পাহাড় ধসের ঘটনাও।
পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, সমস্যার মূল জায়গাটি আইন প্রয়োগে নয়, বরং প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে। পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে না। ফলে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত শ্রমিক বা ছোটোখাটো ব্যক্তিরা শাস্তি পেলেও নেপথ্যের কুশীলবরা থেকে যায় আড়ালে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, খুলশী, আকবরশাহ, পাহাড়তলী, কোতোয়ালী ছাড়া নগরীর সংযোগস্থল সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারী এলাকায় বিস্তীর্ণ পাহাড়গুলোতে দখল ও বসতি নির্মাণ থেমে নেই। আবার ফিরোজশাহ পাহাড়, মতিঝর্ণা ও বাটালী হিলের পাহাড় নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা থাকলেও মামলাগুলো নিষ্পন্ন করার কার্যকর কোন উদ্যোগও নেই। বছরের বেশিরভাগ সময় কোন মাথাব্যথা না থাকলেও বর্ষাকালে পাহাড়গুলোতে ধস হয় বলে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে তৎপর থাকে প্রশাসন। ভারী বৃষ্টির সময়ে নগরীতে অনেকটা ঢাকঢোল পিঠিয়ে বসতিগুলো থেকে লোকজনকে সরানো হলেও পরের দিন পুনরায় আগের বসতিতে ফিরে যান তারা। এতে পাহাড়ের অবৈধ উচ্ছেদের সুফল পাওয়া যায় না।

পাহাড় রক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে। বর্তমানে অন্তত ২৬টি পাহাড়কে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর অধিকাংশই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন। কিন্তু মালিকানা সরকারি হলেও পাহাড় রক্ষার বাস্তব চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়।

২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে ২৪ ঘন্টায় ৪২৫ মিলিমিটারের মতো বৃষ্টিপাত হয়। ওই বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকা, লেডিস ক্লাব, কাছিয়াঘোনা, ওয়ার্কশপঘোনা, শহরের কুসুমবাগ, মতিঝর্ণা, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ প্রায় সাতটি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ওইদিন ভোরে সামান্য সময়ের ব্যবধানে এসব পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ১২৭ জন মারা যায়। এরপর গত ১৪ বছরে এভাবে পাহাড়ধসে মারা গেছে আরও অন্তত আড়াই শ জন। এর মধ্যে ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখানবাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ধসে চার পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগার পাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১২ সালের ২৬-২৭ জুন পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালে মতিঝর্ণায় দেয়াল ধসে দুজন মারা যায়। ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে পাহাড় ধসে মারা যান তিনজন। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মা-মেয়ে মারা যায়। ২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুন রাঙামাটিসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় ১৫৮ জন। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরীর আকবরশাহ থানাধীন ফিরোজশাহ কলোনিতে পাহাড়ধসে মারা যায় চারজন। ২০১৯ সালে কুসুমবাগ এলাকায় পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে ১৭ জুন পাহাড়ধসে মারা যায় আরও চারজন। বিচ্ছিন্ন দু-এক বছর বাদ দিয়ে এভাবে প্রায় প্রতিবছরই বর্ষায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এতে তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই প্রশাসনের।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ছিন্নমূল মানুষদের কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। তাই তারা খরচ বাঁচানোর জন্য এসব ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাতেই বসবাস করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে এ বসতিগুলো নির্মাণ করে থাকেন। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক বলেন, ‘পাহাড়গুলো খাড়াখাড়ি অবস্থায় থাকে। বসতি নির্মাণের সুবিধার জন্য অনেকে পাহাড় কাটে। পাহাড় কাটতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে সরকারি বেসরকারি যেসব পাহাড় রয়েছে, তার বেশিরভাগই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নিয়ন্ত্রণে নেই। এতে প্রভাবশালীরা সুবিধাজনকভাবে দখল করে বসতি নির্মাণ করেছে। কম খরচে কাঁচাঘর নির্মাণ করার কারণে পাহাড়গুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে ধসের ঘটনা ঘটে।’
চট্টগ্রাম মহানগরীর জনপ্রিয় প্রায় সবগুলো এলাকাতেই পাহাড় রয়েছে। এরমধ্যে ডিসি হিল, বাটালি হিল, পরীর পাহাড়সহ বেশ কিছু পাহাড় সংরক্ষণ করা হলেও অসংখ্য পাহাড় রয়েছে সংরক্ষনের বাইরে। সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন এসব পাহাড় সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনাও চোখে পড়ে না। এতে সবুজ পাহাড়গুলোতে ভূমিখেকোদের কু নজর এড়াতে পারছে না প্রশাসনও।
২০০৭ সালের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর পাহাড় রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। সরকার গঠন করে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ৩৬ দফা কর্মপরিকল্পনা। এসব সুপারিশে পাহাড় কাটা বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ এবং পাহাড় সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার দায়ের করা মামলায় ২০১২ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্ট পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পাহাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেন।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সুপারিশ ও নির্দেশনার বড় অংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের আশঙ্কা সামনে এলে সভা-সেমিনার, সতর্কতা এবং উচ্ছেদ অভিযানের আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় রক্ষার উদ্যোগও অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে নতুন করে দখল, বসতি নির্মাণ ও পাহাড় কাটার সুযোগ তৈরি হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব রকম চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু এরপরও এটি রোধ করা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীরা সরে যায়। কিছুদিন পর আবার তারা আগের মতো পাহাড়ে বসবাস শুরু করে। অবৈধ ঝুঁকিপূণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার পর তারা যদি নিজেদের পাহাড়গুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করতো, তাহলে সেখানে পুনরায় অবৈধ বসিত গড়ে উঠতো না। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী বাড়ার পেছনে পাহাড়গুলোর মালিকরাই বেশি দায়ি।
পাহাড় রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে পাহাড় কাটা রোধে ৫৬০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৮৫ কোটি ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত দায়ের করা হয়েছে ৩৭টি মামলা। তবে প্রশ্ন উঠেছে, শত শত অভিযান, কোটি কোটি টাকার জরিমানা এবং একের পর এক মামলা হওয়ার পরও কেন পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email