ব্রাজিল-জাপান মহাযুদ্ধ আজ

ব্রাজিল-জাপান মহাযুদ্ধ আজ

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং কৌশলগত এক লড়াইয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীরা। বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি জাপান।

লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক বনাম এশিয়ান ফুটবলের গতি ও শৃঙ্খলার এ দ্বৈরথকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। একসময় এ লড়াইটি একপেশে মনে হলেও সাম্প্রতিক সমীকরণ বলছে ভিন্ন কথা। কাগজে-কলমে ব্রাজিল শক্তিশালী হলেও মাঠের লড়াইয়ে জাপানকে সমীহ করতেই হচ্ছে সেলেসাওদের। হেক্সা মিশনের স্বপ্নে বিভোর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সেলেসাওরা। এদিকে ব্রাজিলের বিপক্ষে নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে জাপান। আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নামবে জাপান। জাপানিদের বিশ্বজয়ের হুংকার শুধুই স্বপ্ন, নাকি মাঠের নতুন এক রূপকথা। পরিসংখ্যানের এগিয়ে… তবে ঐতিহাসিকভাবে ব্রাজিল ও জাপানের লড়াইয়ে সবসময়ই আধিপত্য দেখিয়েছে হলুদ-সবুজ জার্সিধারীরা। আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুই দলের মুখোমুখি ১৪টি লড়াইয়ের মধ্যে ১১টিতেই শেষ হাসি হেসেছে ব্রাজিল। দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে এবং জাপান জিতেছে মাত্র ১টি ম্যাচে। এ ১৪ ম্যাচে ব্রাজিল প্রতিপক্ষের জালে গোল উৎসব করেছে মোট ৩৭ বার, বিপরীতে জাপানের গোলসংখ্যা মাত্র ৮।

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে জাপানকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল ব্রাজিল। এরপর ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপেও নেইমারের জাদুতে ৩-০ ব্যবধানের সহজ জয় পেয়েছিল সেলেসাওরা। তবে পরিসংখ্যানের এ পাহাড়সম আধিপত্য অতীত পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বর্তমান জাপানের ক্ষেত্রে খাটে না। বর্তমান সামুরাই ব্লুরা যেকোনো পরাশক্তিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ব্রাজিল ও জাপানের ফুটবল দ্বৈরথে সবচেয়ে বড় মোড় আসে গত বছরের (২০২৫) অক্টোবর মাসে। টোকিওর জাতীয় স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল এ দুদল। ম্যাচের প্রথমার্ধেই ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে চরম বিপর্যয়ে পড়েছিল স্বাগতিক জাপান। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের কৌশল পুরোপুরি বদলে ফেলে তারা।

কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবল আর অবিশ্বাস্য গতির ঝড় তুলে ব্রাজিলিয়ান রক্ষণভাগকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় সামুরাই ব্লুরা। ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগে জয়সূচক গোলটি করে জাপান ম্যাচটি জিতে নেয় ৩-২ ব্যবধানে। ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের ফুটবল ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম জয়। সেই ঐতিহাসিক জয় জাপানের আত্মবিশ্বাসকে এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে, এখন তারা যেকোনো বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস রাখে। আসন্ন এ মহালড়াইয়ে মূল আকর্ষণ হতে যাচ্ছে দুদলের ভিন্ন ঘরানার ফুটবল কৌশল। ব্রাজিলের শক্তি তাদের ব্যক্তিগত দক্ষতা, উইং দিয়ে গতিশীল আক্রমণ এবং মিডফিল্ডের ক্রিয়েটিভিটি। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রদ্রিগোদের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের নিয়ে গড়া ব্রাজিলের আক্রমণভাগ যেকোনো রক্ষণের জন্যই দুঃস্বপ্ন। ব্রাজিলিয়ান কার্লো আনচলেত্তি কোচ চাইবেন ম্যাচের শুরু থেকেই বল পজেশন ধরে রেখে জাপানের ওপর চড়াও হতে।

অন্যদিকে জাপানের মূল অস্ত্র তাদের দলগত শৃঙ্খলা, নিখুঁত পাসিং এবং অবিশ্বাস্য কাউন্টার-অ্যাটাক। কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেওয়া জাপান এখন আরো পরিপক্ব। জাপানি মিডফিল্ডার ও ফরোয়ার্ডদের গতি ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারদের বড় পরীক্ষা নেবে। জাপানের রণকৌশল মূলত ডিফেন্স জমাট রেখে প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ নেওয়া এবং বিদ্যুৎ গতিতে পাল্টা আক্রমণে যাওয়া। ম্যাচটিকে কেন্দ্র করে দুদলের অন্দরমহলেই চলছে স্নায়ুযুদ্ধ। ব্রাজিল শিবিরে যেমন রয়েছে গত হারের প্রতিশোধ নেওয়ার তাগিদ, তেমনি জাপানের সামনে সুযোগ নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সেরা সাফল্যটি পাওয়ার। ব্রাজিল অধিনায়ক ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গত বছর তারা আমাদের বিপক্ষে কীভাবে জিতেছিল, তা আমরা ভুলে যাইনি। নকআউট পর্বে কোনো ভুলের ক্ষমা নেই, আমরা আমাদের সেরা ফুটবলটাই খেলব।’

অন্যদিকে জাপানের কোচ বেশ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা ব্রাজিলকে সম্মান করি, কিন্তু ভয় পাই না। আমরা এর আগেও প্রমাণ করেছি যে আমরা তাদের হারাতে পারি। আমাদের ছেলেরা বিশ্বমঞ্চে আরেকটি ইতিহাস গড়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’ নকআউট পর্বের এ ম্যাচে কাগজে-কলমে ব্রাজিলকে ফেবারিট ধরা হলেও ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ম্যাচটি হবে ফিফটি-ফিফটি। ব্রাজিলের আক্রমণভাগের বৈচিত্র্য বনাম জাপানের ইস্পাতকঠিন রক্ষণ এ দুইয়ের লড়াইয়ে যারা স্নায়ু ধরে রাখতে পারবে, শেষ হাসি তারাই হাসবে। ফুটবলপ্রেমীরা প্রস্তুত থাকুন, কারণ ৯০ মিনিটের এ ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে কেবল ফুটবল শৈলী নয়, দেখা যাবে আবেগ, নাটকীয়তা আর ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায় যোগ হওয়ার রোমাঞ্চ!

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email