চট্টগ্রামে অস্তিত্বহীন ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ৬৫টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পেলেন সাড়ে ২৭ লাখ টাকা

চট্টগ্রামে অস্তিত্বহীন ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ৬৫টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পেলেন সাড়ে ২৭ লাখ টাকা

চট্টগ্রামের ৩৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ২২ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং ৩০ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তির জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকাসহ মোট সাড়ে ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। তবে যেসব সংগঠন ও ব্যক্তির নামে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ-সমর্থিত। কিছু কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে তাদের তেমন পরিচিতি ও অবস্থান নেই। এ ধরনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনায় প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।অনুদান দেওয়ার খবর জানেনা বিএনপির কোন নেতা।
জানা গেছে, গত ১৬ জুন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে চট্টগ্রাম জেলার ৩৫টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২২ লাখ ২৫ হাজার টাকা অনুদান মঞ্জুর করেছে। একই সঙ্গে ৩০ জন সংস্কৃতিকর্মীর নামে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা মঞ্জুর করেছে। এর মধ্যে তারা সরকার থেকে মাসিক ১৬ হাজার টাকা করে অনুদান পাবেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিল্পকলা শাখা থেকে জারিকৃত এক আদেশে জানা গেছে, সরকারের অনুমোদনক্রমে নির্বাচিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে প্রদান করা হবে। এ অনুদান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘সাংস্কৃতিক মঞ্জুরি (সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান)’ খাত থেকে ব্যয় নির্বাহ করা হবে। এ লক্ষ্যে জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বরাবর পেমেন্ট অথরিটি প্রেরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে।
অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে নগরীর পাঁচলাইশ সুগন্ধা আবাসিকের উত্তরাধিকার, লালখানবাজার হাই লেভেল রোডের অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়, কোতোয়ালী বংশাল রোডের হাদী ভিলা মঞ্চমুকুট নাট্য সম্প্রদায়, ঘাটফরহাদবেগের জ্যোতি ভবনের নান্দীকার (থিয়েটার), এস. এস. খালেদ রোডের তির্যক নাট্য গোষ্ঠী, চন্দনপুরা আয়েশা খাতুন লেইনের গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়, আলকরণের অঙ্গন থিয়েটার ইউনিট, আন্দরকিল্লা শাহী টাওয়ারের প্যারেন্টাইম মুভমেন্ট, আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোডের থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রাম, ২০০৯ আসাদগঞ্জের কথক থিয়েটার, ১৮৭/২ টাইগার রোডের লোক থিয়েটার, ৫ নম্বর আব্দুস সত্তার রোড, রহমতগঞ্জের নজরুল সংগীত শিল্পী সংস্থা, আন্দরকিল্লা শাহী টাওয়ারের ইনোভেটিভ এ কথক নাট্য সম্প্রদায়, আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোডের অ্যাভিগাড, রহমতগঞ্জ ৮৪, কে. বি. আব্দুস সত্তার রোডের মঞ্চমুকুট নাট্য গোষ্ঠী, ওড়শী অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, চট্টগ্রাম, পাথরঘাটা সতীশ বাবু লেইনের ওরিয়েন্টাল ডান্স সেন্টার, ঘাটফরহাদবেগের ঘুঞ্জুর নৃত্যকলা কেন্দ্র, ২১ হেমসেন লেইনের কথা সুন্দর, পাঁচলাইশ ও. আর. নিজাম রোডের সঙ্গীত ভবন, পটিয়া পৌর সদরের ইব্রাহিম কমপ্লেক্সের ক্যানভাস পাপেট থিয়েটার, ৫ মোমিন রোডের নাট্যমঞ্চ, আসকারদিঘির পশ্চিম পাড়ে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন, ৩ দক্ষিণ খুলশীর সাইলেন্ট থিয়েটার, নন্দনকাননের বাড়ি-৬, রোড-২-এর ফেইম স্কুল অব ডান্স, ড্রামা অ্যান্ড মিউজিক, নন্দনকানন ১ নম্বর গলির প্রাপন একাডেমি, আগ্রাবাদের স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম, হাটহাজারীর ফয়েতাবাদের ঐকতান সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু ভবনের আবৃত্তি মঞ্চ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন, আন্দরকিল্লা দেওয়ানজী পুকুরপাড়ের দেওয়ান বাড়ির প্রতিভাস, পাঁচলাইশ ষোলশহরের হালিম কটেজের কথত নাট্যমঞ্চ, বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদ-ীর বিনয় বাঁশির বাড়ির বিনয় বাঁশি শিল্পী গোষ্ঠী এবং আকবরশাহ ফিরোজশাহ আবাসিক এলাকার সারগাম সংগীত পরিষদসহ মোট ৩৫টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অনুদানপ্রাপ্তির তালিকায় রয়েছে।
এ ছাড়াও চট্টগ্রাম নগরী ও নগরীর বাইরের ৩০ জন সংস্কৃতিকর্মীর নাম সরকারি অনুদানের তালিকায় রয়েছে। তবে কয়েকজন ছাড়া তারা কেউ চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ নন। এর মধ্যে একই ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী মিলে একাধিক সংগঠনের নাম দিয়ে সরকারি অনুদানের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি তারা কেউ কখনো বিএনপি-জামায়াত-সমর্থিত রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত । তারা জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মৌসুমি সরকার রাখীর স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে গত ১৬ জুন সারা দেশের মতো চট্টগ্রাম জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছেও একটি পত্র পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আঞ্চলিক গানের শিল্পী ও গীতিকার প্রয়াত আব্দুল গফুর হালীর নাতনি, বেতার ও টিভি শিল্পী ফেরদৌস হালী জানান, “আমি খুব অসুস্থ। আর্থিক অবস্থাও এত ভালো নয়। আমি অনুদানের জন্য আবেদন করেছিলাম। সব কাগজপত্রও আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলাম। জানি না কী কারণে আমি পাইনি। যারা পেয়েছেন, তাদের কারও আর্থিক অবস্থা খারাপ নয়। অনুদান যার পাওয়ার দরকার, সে না পেয়ে অন্যজন পেলে খুব খারাপ লাগে। আশা করি, আগামীতে সরকার প্রকৃতপক্ষে যে অনুদান পাওয়ার যোগ্য, সে যেন পানÍএমন দাবি থাকবে।”
এ বিষয়ে জাসাস চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্য সচিব মামুনুর রশীদ শিপন বলেন, “তালিকায় যেসব সংগঠন ও ব্যক্তির নাম রয়েছে, তারা অধিকাংশই আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সংগঠন। আগামীতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে আমরা জাসাস সাংগঠনিকভাবে প্রতিবাদ জানাব। যাচাই-বাছাই কমিটিতে চট্টগ্রাম থেকে জাসাসের একজন প্রতিনিধিকে রাখা উচিত। জাসাসের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে কাজ করার কারণে এমন হয়েছে। তালিকা বাতিল করে নতুনভাবে করার দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ মুহাম্মদ আয়াজ মাবুদ বলেন, “কে কীভাবে অনুদান পেয়েছেন, আমি বলতে পারব না। হয়তো কেউ কেউ প্রভাব খাটিয়ে অনুদান নিয়ে নিতে পেরেছেন। তবে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ ওঠে, সে ক্ষেত্রে সরকার চাইলে অনুদান বাতিল করতে পারে। আমরা এ ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা করব।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email