
দেশের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে এবং গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, এমপি। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বিভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষ একসঙ্গে লড়াই করেছেন। দেশের স্বার্থে এই ঐক্য ভবিষ্যতেও অটুট রাখতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ, গণতন্ত্র এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমাদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যােগে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উদযাপন উপলক্ষে বুধবার (৫ আগস্ট ২০২৬) দুপুর ২টায় দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এর আগে সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মরণ চত্বরে অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। এরপর বিজয় র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ১২টা থেকে চবি সমাজবিজ্ঞান অনুষদ অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ও প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাননীয় উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ও ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উদযাপন কমিটি’র আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে জুলাই শহীদদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আজ ৫ আগস্ট। প্রায় দুই বছর আগে এই দিনে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। প্রশ্ন উঠছে, জুলাই-আগস্টের গণহত্যা ও দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অপরাধীদের বিচার কতদূর এগিয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রতি জবাবদিহিতা সর্বোচ্চ। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই জুলাই-আগস্টের গণহত্যা এবং পূর্ববর্তী ১৭ বছরের খুন, গুম ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের আওতায় সুষ্ঠু ও সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করা হবে, ইনশাআল্লাহ। সেই বিচার হবে ন্যায়ভিত্তিক, নিরপেক্ষ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলন। এতে ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, রাজনৈতিক কর্মীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। এই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে রাষ্ট্রবিরোধী ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো অপতৎপরতার স্থান হতে পারে না।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসুন, আমরা শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি। তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
উদ্বোধক ও প্রধান বক্তার বক্তব্যে চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসন সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চাই, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হবে। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, নতুন হল নির্মাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে আমরা সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে চাই।
উপাচার্য জুলাইয়ে চবির দুই শহীদ ফরহাদ ও তরুয়াসহ সকল শহীদকে স্মরণ করেন। উপস্থিত হওয়ার জন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে যত প্রতিকূলতাই আসুক না কেন, ঐক্য, সাহস ও প্রেরণাকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
স্বাগত বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সভাপতি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, জুলাই মাস বিশ্ব ইতিহাসে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে মানবসভ্যতার বিভিন্ন ঐতিহাসিক অধ্যায়ে জুলাই মাস বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও জুলাই মাস নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ, যা বিশ্ববাসীর কাছেও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। জুলাই আন্দোলনে চবির দুই শহীদসহ সকল শহীদের মাগফেরাত কামনা করেন তিনি। তিনি আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করায় সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আজকের দিনটি আমাদের বিজয়ের দিন, গৌরবের দিন এবং আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের দিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। পরপর বিতর্কিত নির্বাচন, ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গুম, হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট এবং সাধারণ মানুষের অধিকার সংকুচিত হওয়ার ঘটনাগুলো মানুষের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
আলোচনা সভা ও সেমিনারে “ইতিহাসের আয়নায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান: ভাবাদর্শের রূপান্তর ও বাস্তবতার অভিঘাত” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ও বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের পরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান। মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর জেরীন চৌধুরী ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হলের প্রভোস্ট এ.জি.এম নিয়াজ উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে চবির শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া ও শহীদ ফরহাদ হোসেনের বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া বক্তব্য রাখেন। আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)-এর জিএস সাঈদ বিন হাবিব, চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল চবি শাখার সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াসিন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চবি শাখার সভাপতি আব্দুর রহমান ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস চবি শাখার সভাপতি সাকিব মাহমুদ রুমী।
অনুষ্ঠানে দুই শহীদ পরিবারকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, এমপিকে জুলাই স্মৃতি স্মারক প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। এরপর জাতীয় সংঙ্গীত ও শহীদদের স্মরণ এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এছাড়া সকল শহীদের মাগফেরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন চবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হাফেজ আবু দাউদ মুহাম্মদ মামুন। অনুষ্ঠানে জুলাইয়ের গান ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চবি ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা সহকারী পরিচালক তাহমিদা খানম। শেষ পর্যায়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
বিরতির পর সমাজবিজ্ঞান অনুষদ অডিটোরিয়ামে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, ‘তিনি আসছেন’ শীর্ষক মঞ্চ নাটক, বিষয়ভিত্তিক নাচ এবং চ.বি. সঙ্গীত বিভাগের পরিবেশনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করা হয়। পরিবেশিত হয় ব্যান্ড দল ‘সরলা’-এর সংগীত পরিবেশনা।
র্যালিসহ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অনুষদসমূহের ডিনবৃন্দ, চবি রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), হলের প্রভোস্টবৃন্দ, প্রক্টর, ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক, বিভাগ/ইনস্টিটিউটের সভাপতি/পরিচালকবৃন্দ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, চাকসু কেন্দ্রের পরিচালক, বিভিন্ন দপ্তরের প্রশাসকবৃন্দ, সহকারী প্রক্টরবৃন্দ, হলের আবাসিক শিক্ষকবৃন্দ, অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ, চবি শাখা ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃকর্মীবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।







