সংস্কৃতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটায় –সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

সংস্কৃতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটায় --সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেছেন, সংস্কৃতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটায়’—এই চেতনাকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতি চর্চায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও সুস্থ সমাজ গঠন করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী আজ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে নজরুল বর্ষ উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভাগীয় পর্যায়ের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্মকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নজরুলচর্চা ও সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে দেশব্যাপী প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। বাংলা সাহিত্য, সংগীত,নাটক ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান অপরিসীম। অথচ নানা কারণে নজরুলের বিশাল সৃষ্টিকর্মের অনেক কিছুই এখনো যথাযথভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। নজরুল বর্ষের মূল লক্ষ্য হলো তাঁর সৃষ্টিকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলা। তিনি উল্লেক করেন, গত ২৩মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ময়মনসিংহের ত্রিশালে কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়। আগামী ৩১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংগীত, কবিতা, নাটক ও নৃত্য—এই চারটি বিষয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায় থেকে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং জাতীয় পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। কোনো শিক্ষার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে সরাসরি প্রতিযোগিতায় পাঠানো নয়; বরং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রতিযোগী নির্বাচন করতে হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের যথাযথ মনিটরিং করার আহ্বান জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কয়েকজন বিজয়ী নির্বাচন করাই নজরুল বর্ষের উদ্দেশ্যে নয়। যারা বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে, তাদেরকেও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নির্বাচিত হয়ে এসে উপজেলা, জেলা,বিভাগ থেকে বাদ যাবো সেসকল অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরবর্তীতে শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে সারাদেশে সাংস্কৃতিক চর্চার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে। এই নজরুল বর্ষের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক শিক্ষা; মাদ্রাসা; কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত করা হবে। সরকারি-বেসরকারি কলেজের পাশাপাশি মেডিকেল, কারিগরি, ভেটেরিনারি ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ কর্মসূচির আওতায় আসবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মসূচির সার্বিক সমন্বয় করবেন বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা স্থানীয় বাস্তবতার আলোকে কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যয় সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে। তবে বিদ্যালয় পর্যায়ের ছোট পরিসরের আয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সম্পন্ন করতে হবে। তিনি বলেন, আগামী ৩১ আগস্ট জেলা শহরগুলোতে সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।
সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা নয়; মানুষের মনন, চিন্তা, জীবনযাপন, সাহিত্য, বই পড়া, জাদুঘর, ঐতিহ্য, প্রত্নতত্ত্ব, পোশাক, খাবার, রান্না, পিঠা উৎসব—সবকিছুই সংস্কৃতির অংশ।’ তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উপর গুরুত্বারোপ করে দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর ও যুগোপযোগী করার জন্য সরকার কাজ করছে বলে জানান। সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও প্রবিধানগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে,সেইসাথে সংগীত, বাদ্যযন্ত্র, নাটক, যাত্রাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দক্ষ প্রশিক্ষক ও শিল্পী তৈরির জন্য দেশব্যাপী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।দেশের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতচর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রশিক্ষিত শিল্পী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক জেলা থেকে প্রতিভাবান শিল্পীদের নির্বাচন করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন বাহিনীর নিজস্ব ব্যান্ড ও অর্কেস্ট্রাকে আরো সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দিনের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত ড. সুকোমল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম ৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সিএমপি কমিশনার হাসান মোঃ শওকত আলীসহ প্রমুখ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী মতবিনিময় সভার পূর্বে চট্টগ্রাম জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, জিয়া স্মৃতি জাদুঘর একটি অত্যন্ত পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী ভবন। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ভবনটির মূল কাঠামো ও নির্মাণশৈলী অক্ষুণ্ন রেখেই সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র একটি ভবন নয়, দেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সাধারণ অর্থে ভবনটি মেরামত না করে এর মৌলিক কাঠামো ও ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করে পুনর্গঠন করা হবে। তিনি বলেন, দেশের পুরনো ঐতিহ্য ও স্থাপনাগুলো থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সে কারণে ভবনটি যেভাবে মূলত নির্মাণ করা হয়েছিল, তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও গঠন প্রক্রিয়া যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রেখে সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email