
দেশের মৎস্যসম্পদ ও জলাশয় রক্ষায় মৎস্যজীবীদের পাশাপাশি সব নাগরিককে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আজ রোববার সকাল সাড়ে নয়টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত আলোচনা সভায় তাঁরা এ আহ্বান জানান। জেলা প্রশাসন ও জেলা মৎস্য অধিদপ্তর এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘রুপালি মাছে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে দেশের নদী ও জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারেন্ট জালের ব্যবহারে মাছের বিভিন্ন প্রজাতি ও পোনা ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক উৎসের মাছ ও পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে একসময় দেশের মৎস্যসম্পদ মারাত্মক সংকটে পড়বে।
হালদা ছাড়া দেশের অধিকাংশ নদী অসুস্থ হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, নদী ও পরিবেশের ক্ষতি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মৎস্যজীবীরা। তাই মৎস্যসম্পদ ও প্রতিবেশ রক্ষায় তাঁদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
দেশের মৎস্য উৎপাদনের বড় অংশ এখন চাষের মাছ থেকে আসে বলে জানান বিভাগীয় কমিশনার। তিনি বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রয়োজন। মৎস্যজীবীদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত মাছ বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হবে।
নীল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত উল্লেখ করে মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, সমুদ্রের বিপুল সম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু সম্পদ আহরণ করলে হবে না; সম্পদ পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে চট্টগ্রাম জেলার ২৭ হাজার ৬৩১ জনকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হয় জানিয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। কোনো ভুয়া ব্যক্তি যেন সুবিধা না পান, সে জন্য প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করতে মৎস্যজীবীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের কর্মসূচি শুধু আলোচনা সভা ও র্যালির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, একসময় দেশের মিঠাপানির মাছের যে স্বাদ ও বৈচিত্র্য ছিল, তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। দখল, দূষণ ও আবর্জনার কারণে পুকুর, খালসহ বিভিন্ন জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অবশিষ্ট জলাশয়গুলো রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে।
চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, গত ২৬ জুলাই থেকে এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। এর ধারাবাহিকতায় পুকুর পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার সরকারি-বেসরকারি পুকুরগুলো পরিষ্কার করা হবে। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক নিজ দায়িত্বে পুকুর পরিষ্কার করেছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘পুকুরগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে সেখানে মাছ চাষ করা যায় এবং আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ পরিবেশে সাঁতার কাটতে পারে। শুধু প্রশাসন বা কোনো একটি বিভাগের উদ্যোগে সমাজের পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রত্যেক নাগরিককে এ উদ্যোগে যুক্ত হতে হবে।’
মৎস্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতার ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ৫০ বছর আগের পদ্ধতি দিয়ে বর্তমান সময়ের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। মাছের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগও সম্প্রসারণ করতে হবে।
মৎস্যজীবীদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আকবর আলী ঘাটের জেলেপল্লিতে ইতিমধ্যে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিদ্যালয়টির প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং মৎস্যজীবীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।
আলোচনা সভার পর সার্কিট হাউস থেকে একটি র্যালি বের করা হয়। পরে নগরের লালদীঘি পুকুরে ২০ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা,বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও মৎস্যজীবী উপস্থিত ছিলেন।







