ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর : সোর্স গ্রেফতার, প্রত্যাহার ২ পুলিশ সদস্য

ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর : সোর্স গ্রেফতার, প্রত্যাহার ২ পুলিশ সদস্য

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন নাঈম হাসান। কিন্তু সেই ক্রিকেটারই এবার চট্টগ্রামে পুলিশের অভিযানের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। চোরাচালান সন্দেহে গভীর রাতে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধর, জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা এবং থানায় নিয়ে হেনস্তার অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হলেও অভিযানের পদ্ধতি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে আটক, শারীরিক নির্যাতন ও হেনস্তার অভিযোগে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই), এক কনস্টেবল ও পুলিশের এক সোর্সের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার পর সোর্স সোহেলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি এ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

শুক্রবার (১২ জুন) রাতে চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানায় নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির হাসান বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন এসআই শফিকুল, কনস্টেবল রাসেল ও সোর্স সোহেল।
নাঈম হাসান সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামে ফেরেন তিনি। রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন।

তিনি বলেন, ‘এয়ারপোর্ট থেকে সিএনজিতে করে আসছিলাম। ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখান বাজারের দিকে সিএনজি দাঁড় করায় পুলিশ। আমি বের হয়ে দাঁড়াই। বললাম ব্যাগ চেক করেন। তবে ওই পুলিশ সদস্য আমাকে বলে, তুই গাড়িতে ওঠ, তুই আসামি। এরপর গলা চিপে ধরে আমাকে সিএনজিতে উঠাইছে। আমি বের হওয়ার চেষ্টা করলে দু’জন আমাকে চেপে ধরে আরেকজন মারধর করতে থাকে পাইপ দিয়ে। দু’জন পুলিশ ও একজন পাঞ্জাবি পরা কেউ ছিল।

নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তখন নিজের পরিচয় দিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয়পত্র দেখান। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।

নাঈম বলেন, ‘আমি পরিচয়পত্র দেখানোর পরও এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে আমার কোমরে আঘাত করেন। সঙ্গে থাকা একজন ব্যক্তি পাইপ দিয়ে মারধর করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমার ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। তারা বলছিল, ‘তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।

তিনি অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি তার কাছে আরও সন্দেহজনক মনে হয়েছে, কারণ ঘটনাস্থলে পুলিশের নিজস্ব গাড়ি থাকলেও সেখানে তাঁকে তোলা হয়নি।

নাঈমের অভিযোগ, মারধরের পর তাকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ওসির কক্ষে নেওয়া হলে সেখানেও তিনি বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন ঘটনার বিস্তারিত বলছিলাম, তখন ওসি বারবার চোখ নিচু করে কথা বলতে বলছিলেন। পরে একটি ফোন পাওয়ার পর তাঁর আচরণ পরিবর্তন হয়।’

অভিযোগ অনুযায়ী, অটোরিকশা থেকে নামানোর পর তার মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। থানায় গিয়ে ফোন ফেরত পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোন করেন। পরে বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরু বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

নাঈম বলেন, ‘আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক লোক থানায় এসেছে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জন্য তো কেউ আসবে না। তাই আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘এসআই শফিকুল ইসলাম অভিযানের বিষয়ে আমাকে কিছু জানাননি। থানায় আনার পর আমরা জানতে পারি তিনি জাতীয় দলের ক্রিকেটার। এরপর আমরা দুঃখ প্রকাশ করে তাকে সম্মানের সঙ্গে চলে যেতে অনুরোধ করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং অভিযানে অংশ নেওয়া আরেক কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজ করা n‡q‡Q|

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম বর্তমানে ছুটিতে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তিনি এসআই শফিকুল ইসলামকে তথ্য দেন যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সোনার চোরাচালান আসতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই লালখান বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

মনিরুল দাবি করেছেন, তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে এই তথ্য পেয়েছিলেন।তবে অভিযানের সময় তথ্য যাচাই, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘চোরাচালানের একটি তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে সেই তথ্য কতটা নির্ভুল ছিল এবং অভিযানের আগে প্রয়োজনীয় নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অভিযান পরিচালনার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে এখানে ভুলত্রুটি রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিসিবি ও কোয়াবের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ
জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অশোভন আচরণে ক্রীড়াঙ্গনসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব।

শনিবার সকালে এক বিবৃতিতে বিসিবি জানায়, নাঈম হাসানকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কয়েকজন সদস্য কর্তৃক হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বোর্ড গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। অনাকাঙ্ক্ষিত এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। বিসিবি ও কোয়াবের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে এবং নাঈমের পরিবারের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email