
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়, এ জন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর একসঙ্গে হাঁটবে। বর্তমান সরকার ব্যবসাবান্ধব। সরকার ব্যবসা সম্প্রসারণে নীতি সহায়ক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করবে।
রবিবার (৩০ আগস্ট) দুপুরে পতেঙ্গায় এপিএম টার্মিনাল লালদিয়ার নির্মাণকাজে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোয় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের নির্বাচিত সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব সরকার। যার আছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক কর্মসূচি। তবে আমরা সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছি।’

ডেনমার্কের বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান বিশ্বের শীর্ষ বন্দরে টার্মিনাল পরিচালনা করছে। এপিএম এ টার্মিনাল নির্মাণে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এবং যতটুকু জানি, তা পর্যায়ক্রমে আরও বাড়তে থাকবে। এপিএম মুলারের বাংলাদেশে আসাটা মাইলস্টোন। তারা লালদিয়ায় আধুনিক বন্দর নির্মাণ করবে। এ ক্ষেত্রে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এপিএম টার্মিনালসের বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও লালদিয়ায় আধুনিক বন্দর নির্মাণ একটি মাইলফলক। আমি আনন্দিত, আমার সংসদীয় আসনে এ টার্মিনাল হচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘আজ নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানের হতে চলেছে। লালদিয়া এপিএম টার্মিনাল পিপিপি পদ্ধতিতে বড় বিনিয়োগ। এখানে অনেক ফ্যাসিলিটিজ থাকবে, যা জাতির জন্য সুসংবাদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এখানে বাণিজ্যিক হাব রয়েছে, সেটি আরও প্রসারিত হচ্ছে। বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহী আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’
স্বাগত বক্তব্যে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড বলেন, ‘টার্মিনালে অ্যাডভান্সড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। টার্মিনালে ৭টি শিপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্র্যাক্টর থাকবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেনার হ্যান্ডেলিংয়ের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পাবে।’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান গেটওয়ে। এ বন্দর দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এবং ৯৮ শতাংশের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। বিদেশি বিনিয়োগ অংশীদারদের বাংলাদেশে স্বাগত জানাচ্ছি।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, এপিএম টার্মিনালসের বিভি’র গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লেমেন্টেশন জেক ক্রেইগ, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার। এছাড়া চট্টগ্রাম স্থানীয় সাংসদ এরশাদ উল্ল্যাহ, শাহজাহান চৌধুরী,সরওয়ার জামাল নিজাম,চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান ইন্জিনিয়ার জানে আলম সেলিম,সিডিএ চেয়ারম্যান ইন্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, চিটাগং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিসের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক, চট্টগ্রাম সিএন্ডএফ এসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।

এর আগে সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প দক্ষভাবে পরিচালনা করায় সরকারের অপচয় কমেছে। প্রকল্পের পাইলট প্রজেক্টে ১ দশমিক ২ শতাংশ ভুল হয়েছে, যা খুবই কম। সঠিক ডিস্ট্রিবিউশন না থাকলে সেখানে লস হয়।
তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রতিটি কাজে পার্টনারশিপ ডেভেলপ করা হয়েছে। এটা শুধু বন্যা পুর্নবাসনের কারণে নয়, ক্রিয়েটিভ ইকোনমির নতুন মডেল চালু করা হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
জানা গেছে, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের মূল অংশ নির্মিত হবে ৩২ একর জায়গায়। এর সঙ্গে ৭ দশমিক ১৫ একর কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে গড়ে উঠবে পুরো টার্মিনাল।টার্মিনালে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটির মাধ্যমে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হবে। এর বার্ষিক সক্ষমতা হবে প্রায় ৮ লাখ টিইইউএস (২০ ফুট সমমানের কনটেইনার)। প্রকল্পটিতে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বিনিয়োগ প্রকল্প বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পটি নির্মাণে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর। নির্মাণ শেষে ২০৩০ সাল থেকে পরবর্তী ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে ডেনিশ কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ ও যথাযথভাবে পালন করা হলে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪৮ বছর পর্যন্ত টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। পরে ২০২৩ সালের ২১ মে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। একই বছরের ২৯ নভেম্বর প্রকল্পটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন ব্যাবসায়ীরা। লালদিয়া এলাকায় দেশের প্রথম গ্রিনফিল্ড বন্দর প্রকল্প, যা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বাস্তবায়িত হবে। উদ্যোগ নেওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর অবশেষে প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পেতে চলেছে।লালদিয়া এ টার্মিনাল হবে বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত প্রথম জ্বালানি সাশ্রয়ী, স্বয়ংক্রিয় গ্রিন পোর্ট। ডিজেলের পরিবর্তে এখানে ব্যবহার হবে সৌর বিদ্যুৎ বা হাইব্রিড সিস্টেম।








