,

রমজানের আগেই খাতুনগঞ্জে কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা, বাড়তে পারে নিত্যপণ্যের দাম

রমজানের আগেই খাতুনগঞ্জে কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা, বাড়তে পারে নিত্যপণ্যের দাম

চট্টগ্রামের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও কোরবানিগঞ্জ মিলিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাণিজ্য কেন্দ্র। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, মসলা, গমসহ নানা নিত্যপণ্যের বড় অংশের বেচাকেনা হয় এই এলাকায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পণ্য কিনে নিয়ে যান। ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বৃহৎ বাজার হিসেবে পরিচিত খাতুনগঞ্জের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে নদী, খাল ও জনপদ গড়ে ওঠার দীর্ঘ ইতিহাস।এখানে ব্যাবসায়ীদের হাতেই থাকে পন্যের দামের সুতা।সে সুতা টান দিলে বিভিন্ন দ্রব্য মূল্যের দাম বাড়ে আর কমে।
পবিত্র মাহে রমজান আসতে এখনো কয়েক মাস বাকি। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য মজুদ করার অভিযোগ উঠেছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ছোলা, ডাল, খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতির আড়ালে কেউ কেউ অতিরিক্ত পণ্য মজুদ করছেন বলে অভিযোগ করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। এতে রমজানের আগে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর আশঙ্কা করছেন সাধারণ ক্রেতা ও ভোক্তারা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর রমজান ঘনিয়ে এলেই খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্যের চাহিদাকে পুঁজি করে একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বাজারে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। কখনো সরবরাহ সংকটের কথা বলে, কখনো আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। অথচ বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকার পরও সরবরাহ সীমিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
খাতুনগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার। এখানকার বাজার পরিস্থিতির ওপর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিত্যপণ্যের দামের প্রভাব পড়ে। ফলে এ বাজারে পণ্য মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে গিয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রমজান মাসে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়ে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, রমজানের কয়েক মাস আগে থেকেই আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানি, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের পরিকল্পনা থাকে। এটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে পণ্য মজুদ করে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দাম বাড়ানো হলে তা ভোক্তাদের জন্য বড় ধরনের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছোলা আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন।২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্টে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ১৭ হাজার ১৭৭ টন। ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৮১ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ দুই মাসে আমদানি বেড়েছে ১৫ হাজার ৭৯৬ টন।২০২৬ সালে রমজান শুরু হয়েছিল ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওই রমজানকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৯২ টন। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আমদানি হয়েছে ৭৯ হাজার ৭৭১ মেট্রিক টন।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে ছোলার চাহিদা গড়ে ১০-১২ হাজার টন। তবে রমজান মাসে এই চাহিদা ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টনে গিয়ে দাঁড়াই। এই হিসাবে, দেশে ছোলার বার্ষিক চাহিদা ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টন।

এদিকে বাজারে পণ্য মজুদের অভিযোগ, গুদামে পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি এবং পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান নিয়ে কার্যকর নজরদারির দাবি উঠেছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বাজারে সম্ভাব্য কারসাজি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে?

দাম বাড়ানোর পেছনে কৃত্রিম সংকট বা কোনো সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বাজারের মজুত, আমদানিকারকদের বিক্রির তথ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। মূলত বাজার তদারকির অভাবেই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছোলার চাহিদা কত, আমদানি কত হচ্ছে, আমদানি খরচ কত পড়ছে এবং কী দামে বিক্রি হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাজারকে মুক্ত করা কঠিন হবে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে রমজান পর্যন্ত তা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

রমজানের বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; আমদানিকারক, আড়তদার, পাইকারি বিক্রেতা ও গুদাম পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যবসায়ী অস্বাভাবিক পরিমাণে পণ্য মজুদ করছেন কি না, আমদানির পর পণ্য বাজারে ছাড়ছেন কি না এবং একই পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, রমজানের আগেই বাজার মনিটরিং জোরদার করা না হলে শেষ মুহূর্তে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই এখনই খাতুনগঞ্জের বড় আড়ত ও গুদামগুলোতে পণ্যের মজুদ, আমদানি, সরবরাহ এবং বিক্রয়মূল্যের তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
সাধারণ ভোক্তাদের প্রত্যাশা, রমজানকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যেন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসন আগেভাগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ও মজুদদারির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমনটাই প্রত্যাশা নগরবাসীর।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ছোলার বুকিং রেট বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। তবে বর্তমানে ছোলার সরবরাহে বড় ধরনের সংকট নেই।