নতুন বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক তারেক রহমান!

নতুন বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক তারেক রহমান!
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এখন পর্যন্ত জনমত জরিপগুলোতে প্রধানমন্ত্রী পদের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। আল জাজিরা, টাইম ম্যাগাজিন ও ক্রাইসিস গ্রুপের মতো বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থাগুলো এখন প্রশ্ন তুলছে—শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে তারেক রহমানই কি সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবেন?

২০০৮ সালে দেশত্যাগের পর লন্ডনে অবস্থান করা তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করেছেন। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘প্রডিগাল সান’ বা ‘প্রত্যাবর্তিত পুত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে লিখেছে, তিনি এখন বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্যবিধাতা হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় দাবিদার।

ঢাকার উপকণ্ঠ গাজীপুর থেকে শুরু করে সিলেট বা চট্টগ্রামের প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমানকে দেখতে এবং শুনতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ডিসেম্বরে মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের একক অভিভাবক হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম বড় পরীক্ষা। তৃণমূল কর্মীদের সাথে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বিএনপির জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি এখনো অটুট।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে তারেক রহমানের নেতৃত্বের তিনটি প্রধান দিক ফুটে উঠেছে।

১. দীর্ঘ প্রবাস জীবনে থেকেও তিনি দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। তবে দেশে ফেরার পর ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ সামলানো তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২৯৯টি আসনের মধ্যে অন্তত ৭৯টিতে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে, যা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে স্পষ্ট করে।

২. সমালোচকদের চোখে এক সময় ‘বিতর্কিত’ থাকলেও, এবারের নির্বাচনী ইশতেহার ও বক্তৃতায় তারেক রহমান অনেক বেশি ‘পলিসি মেকার’ বা নীতি-নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

৩. তাঁর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ‘প্রভু নয়, বন্ধু’ হিসেবে সম্পর্কের অঙ্গীকার বিশ্ব মহলে নতুন করে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে তাঁর ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা। প্রচারণার প্রতিটি সভায় তিনি এই রূপরেখাকে ‘নতুন বাংলাদেশের সনদ’ হিসেবে তুলে ধরছেন।

এর উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো সংবিধান সংশোধন করে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা এবং পরপর দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে না পারার ঐতিহাসিক বিধান।

অভিজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে আইনসভায় একটি ‘উচ্চ কক্ষ’ গঠন করা, যাতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুণগত পরিবর্তন আসে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংবিধানে স্থায়ীভাবে ‘নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন।

প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সব মতের মানুষের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে স্বাধীন বিচারিক কমিশন গঠন। যুবকদের জন্য ‘এমপ্লয়মেন্ট কার্ড’ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।

আগামী বৃহস্পতিবারের ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে সারাদেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও আনসারসহ প্রায় ১০ লক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।

৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই সারাদেশে ১ লক্ষ সেনাসদস্য মাঠে কাজ শুরু করেছেন। ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্পের মাধ্যমে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করছেন। দেশের প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ ফোর্সের পাশাপাশি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও সিসিটিভির ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত রাতে তারেক রহমান বিটিভির মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ভোটারদের ভয়হীনভাবে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদেরই দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। এছাড়া জুলাই বিপ্লবের নেতাদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। জামায়াত আমীর শফিকুর রহমান ইতিমধ্যে তারেক রহমানকে একটি প্রকাশ্য বিতর্কের (Debate) আহ্বান জানিয়েছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সংস্কৃতি।

তবে শঙ্কার জায়গা হলো রাজনৈতিক সহিংসতা। টিআইবি-র এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সহিংসতার ৯১ শতাংশের সাথে বিএনপির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এটি তারেক রহমানের জন্য একটি ইমেজ সংকট তৈরি করতে পারে।

আগামী বৃহস্পতিবারের ব্যালট যুদ্ধই নির্ধারণ করবে তারেক রহমান কি সত্যিই বাংলাদেশের ‘পরিবর্তনের নায়ক’ হতে পারবেন কি না। তাঁর বক্তৃতায় তিনি অঙ্গীকার করেছেন—নির্বাচিত হলে দুর্নীতি দমনে তিনি হবেন ইতিহাসের কঠোরতম শাসক। ১৭ বছরের নির্বাসন কি তাঁকে একজন দক্ষ জননেতায় রূপান্তরিত করেছে? এর উত্তর পাওয়া যাবে ১২ ফেব্রুয়ারির জনগণের রায়ে। দেশবাসী এখন শ্বাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষায় সেই মহেন্দ্রক্ষণের জন্য।

প্রদত্ত ছবিটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি ধারা বর্ণনা করে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।

নতুন বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক তারেক রহমান!নতুন বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক তারেক রহমান!নতুন বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক তারেক রহমান!

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সরকার পরিচালনার ইতিহাসে বিভিন্ন ধরণের শাসনব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি নির্বাচিত সরকারপ্রধান ছিলেন। ১৯৭৫ সালে স্বল্প সময়ের জন্য খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় আসেন, যা সামরিক শাসনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আবু সাদাত সায়েম সামরিক শাসনের অধীনে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমান এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আবদুস সাত্তার সামরিক শাসনের সময়কালে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ছিলেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করে। এরপর গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পুনরায় খালেদা জিয়া নির্বাচিত সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করে। পরবর্তীতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনা নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন। সর্বশেষ, ২০২৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুহাম্মদ ইউনূস তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে দেশের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email