চার দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাসের নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর

চার দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাসের নির্দেশ অর্থমন্ত্রীর

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা কাঁচামাল ও বিভিন্ন পণ্য দ্রুত খালাস নিশ্চিত করতে চার দিনের মধ্যে শুল্কায়ন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান, যাতে বন্দরের কার্যক্রমে গতি ফিরে আসে এবং আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা দীর্ঘসূত্রতার শিকার না হন।

শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগ এলাকায় নিজের বাসভবনে আয়োজিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ নির্দেশনার কথা জানান। বৈঠকে অংশ নেয় বন্দর ইউজারস ফোরামের নেতৃবৃন্দ, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

মন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বন্দর ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা অপরিহার্য। আমদানি পণ্য বন্দরে পড়ে থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, শিল্পকারখানায় কাঁচামালের সংকট তৈরি হয় এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ধীরগতি দেখা দেয়। এ অবস্থায় চার দিনের মধ্যে শুল্কায়ন সম্পন্ন করে পণ্য খালাস নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমবে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।

বৈঠকে উপস্থিত বন্দর ব্যবহারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে চলমান নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। আমীর খসরু জানান, আলোচনায় বেশ কিছু সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কিছু বিষয় আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে, সেগুলো সমাধানে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

তিনি বলেন, “যেসব সিদ্ধান্ত নিতে অন্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন, সেগুলো দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। সমস্যাগুলোর সমাধান হলে বন্দরের কার্যক্রমে আরও গতি আসবে এবং পণ্য খালাস প্রক্রিয়া সহজ হবে।”

মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, পণ্যজটের কারণে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ডেমারেজ ও ভাড়া গুনতে বাধ্য হন। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে। দ্রুত শুল্কায়ন ও খালাস নিশ্চিত করা গেলে সামগ্রিক ব্যয় হ্রাস পাবে।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ-এ দীর্ঘদিন ধরে একাধিক স্ক্যানিং মেশিন অচল থাকার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পায়। এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দপ্তরকে নির্দেশ দেন, দ্রুত এসব স্ক্যানিং মেশিন সচল করতে হবে। “এত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি কীভাবে দিনের পর দিন অচল থাকে—এটা গ্রহণযোগ্য নয়,” মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, স্ক্যানিং মেশিন অচল থাকায় পণ্য পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়, যা বন্দরে কনটেইনার জটের অন্যতম কারণ। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা দূর না করলে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা আসবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এ ধরনের গাফিলতি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল চট্টগ্রামে আমীর খসরুর প্রথম সরকারি সফর। বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়ের অংশ হিসেবেই এই সফর অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে তিনি বলেন, নতুন সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।

তিনি আরও যোগ করেন, দেশের রপ্তানি ও আমদানি কার্যক্রমের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকর ব্যবস্থাপনা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারা বন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, কাগজপত্র যাচাই প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, চার দিনের মধ্যে শুল্কায়ন সম্পন্ন হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে না। অনেক সময় কাঁচামাল বন্দরে আটকে থাকায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা সম্ভব হয় না।

তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নথিপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া জোরদার করতে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে।

এছাড়া বন্দরের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জোরদার করার কথাও বলেন তিনি। কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের পরামর্শ দেন, যাতে সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা যায়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পণ্য খালাসে বিলম্ব তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আমদানিকৃত কাঁচামাল সময়মতো ছাড় না হলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়। তারা অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনাকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।

মন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি গতিশীল রাখতে বন্দর সংস্কার অপরিহার্য। আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল শুল্কায়ন প্রক্রিয়া এবং দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বন্দরজট অব্যাহত থাকলে সরবরাহ চেইনে চাপ সৃষ্টি হবে, যা মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহযোগিতায় দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দর নতুন উদ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

চার দিনের মধ্যে শুল্কায়ন সম্পন্ন করে পণ্য খালাস নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্ক্যানিং মেশিন সচল করা, প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়ানো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-এর মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ-এর কমিশনার শফিউদ্দিন, অতিরিক্ত কমিশনার তাফসির উদ্দিন ভূঁইয়া এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও স্টেকহোল্ডার প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email