
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামে ডে কেয়ার সেন্টার নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। শনিবার সকালে নগরীর বাকলিয়ায় ধর্ষণচেষ্টার শিকার আহত শিশুটির খোঁজ নিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন। এসময় তিনি শিশুটির স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসকদের কাছ থেকে তার চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর নেন।
পরিদর্শনকালে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন এবং দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি জানান, একই ধরনের একাধিক ঘটনার তথ্য তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি বাইজিদ ও চান্দগাঁও এলাকায় সংঘটিত দুই শিশুর ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ভুক্তভোগী শিশুদের বয়স সাড়ে তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এবং তাদের মায়েরা গার্মেন্টস কর্মী এবং বাবা রিকশা চালক। অর্থ্যাৎ, আর্থিক সঙ্কটে তাদেরকে সন্তানকে রেখে বাহিরে থাকতে হচ্ছে।
মেয়র বলেন, “আমি আজ তিনজন মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনজনই গার্মেন্টস শ্রমিক। তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেন, অথচ বাসায় ছোট শিশুদের দেখাশোনার মতো কেউ থাকে না। এই সুযোগে কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষ শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে নির্যাতনের শিকার করছে। এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি আমাদের সমাজের ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।”
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে একটি ডে কেয়ার সেন্টার নির্মাণ করার ঘোষণা দিয়ে মেয়র বলেন, চট্টগ্রামের শ্রমজীবী পরিবারের ছোট শিশুদের জন্য আমরা একটি আধুনিক ডে কেয়ার সেন্টার করবো। আমি ইতোমধ্যে জায়গা খুঁজছি। ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুত এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
গার্মেন্টসকর্মীদের সন্তানদের সুরক্ষায় গার্মেন্টস মালিকদের ডে কেয়ার সেন্টার চালু করার আহবান জানিয়ে মেয়র বলেন, দেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যারা এই খাতকে শ্রম দিয়ে সমৃদ্ধ করছে, তাদের সন্তানরা যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তিনি গার্মেন্টস মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। আপনাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ডে কেয়ার সেন্টার করা কোনো কঠিন কাজ নয়। সেখানে শিশুদের জন্য খেলাধুলা, শিক্ষা, খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।”
মেয়র আরও বলেন, চমেকের ওসিসি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে গত আট বছরে ১২ বছরের নিচে অন্তত ৪২২ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে। এর বাইরেও লজ্জা ও সামাজিক সংকোচের কারণে অসংখ্য ঘটনা প্রকাশ পায় না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “শুধু টাকা উপার্জন করলেই হবে না। সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়বদ্ধতা রয়েছে। ছোট ছোট শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং শিল্পমালিক—সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থমন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানাচ্ছি গার্মেন্টসের অনুমোদন প্রদানের ক্ষেত্রে যে বিভিন্ন রিকোয়ারমেন্টসের আওতায় আনা হয় এটা যেন বাধ্যতামূলক করা হয় যে তাদেরকে ডে কেয়ার সেন্টার করতে হবে। গত বছর বর্ষাকালে হালিশহরে গার্মেন্টস কর্মীর তিন বছরের শিশু ড্রেনে পড়ে মারা যায়। কারণ তখন তাকে দেখার কেউ ছিল না। এ ধরনের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ডে কেয়ার সেন্টার এখন সময়ের দাবি।”
শিশুদের একা বাইরে না পাঠাতে এবং দোকানে ছোট শিশুদের পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দোকানের আশেপাশে ঘোরাফেরা করা অপরাধীরা শিশুদের টার্গেট করছে। তাই অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।
আইন সংশোধনের দাবিও জানান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, “যারা নিষ্পাপ শিশুদের ওপর এ ধরনের পাশবিক নির্যাতন চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। তাদেরকে জনসম্মুখে ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে যাতে করে এই ধরনের সাহস আর কেউ না পায়। এই ধরনের আইন দ্রুত প্রণয়ন করে এবং এগুলো দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সাত দিনের মধ্যে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।”







