১৮ গোলের মহাকাব্য : দুই দশকের রাজত্ব শেষে মেসির মাথায় ইতিহাসের মুকুট

১৮ গোলের মহাকাব্য : দুই দশকের রাজত্ব শেষে মেসির মাথায় ইতিহাসের মুকুট

ডালাসের রাতটা শুরু হয়েছিল হতাশা দিয়ে, শেষ হয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল এক মুহূর্তে। লিওনেল মেসি যখন ম্যাচের নবম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেন, তখন হয়তো খুব কম মানুষই ভাবতে পেরেছিলেন যে কয়েক মিনিট পরই তিনি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত রেকর্ডের মালিক হতে যাচ্ছেন।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি মেসি। তার নেওয়া শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে গ্যালারিতে নেমে আসে হতাশা। তবে সেই ব্যর্থতা বেশিক্ষণ তাকে আটকে রাখতে পারেনি।

প্রথমার্ধের ৩৮ মিনিটে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ফাকুন্দো মেদিনার কাছ থেকে বল পেয়ে দারুণ দক্ষতায় আক্রমণ গড়ে তোলেন মেসি। এরপর বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে পরাস্ত করেন অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারকে। বল জালে জড়াতেই ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় লেখা হয়ে যায়।

এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৭-তে নিয়ে যান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ফলে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠেন তিনি।

কিন্তু মেসির রাত তখনও শেষ হয়নি।

ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে, যোগ করা সময়ের ৯৪ মিনিটে আবারও গোল করেন তিনি। অস্ট্রিয়ার জালে দ্বিতীয়বার বল পাঠিয়ে নিজের গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নেন ১৮-তে। ফলে রেকর্ডটাকে আরও দূরে নিয়ে যান এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

আরও বিশেষ একটি কারণেও রাতটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাত্র দুই দিন পরই ৩৯ বছরে পা দেবেন মেসি। অথচ বয়সের ছাপ তার খেলায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। মাঠে তার ক্ষুধা, আত্মবিশ্বাস এবং গোলের প্রতি তাড়না এখনও তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতোই।

চলতি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন মেসি। সেই তিন গোল তাকে ক্লোসার রেকর্ডের সমতায় নিয়ে গিয়েছিল। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে এবার তিনি একাই উঠে গেলেন শীর্ষে।

বিশ্বকাপে নারী ও পুরুষ ফুটবলারদের মধ্যে তার সামনে ছিলেন কেবল ব্রাজিলের কিংবদন্তি মার্তা, যার গোলসংখ্যা ১৮। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করে সেই সংখ্যাতেও পৌঁছে গেছেন মেসি।

দুই দশক আগে শুরু হয়েছিল তার বিশ্বকাপ যাত্রা। ২০০৬ সালে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে প্রথম গোল করেছিলেন তিনি। এরপর কেটে গেছে ২০ বছর। এই সময়ে ২০১০ বিশ্বকাপ ছাড়া প্রতিটি আসরেই গোলের দেখা পেয়েছেন মেসি।

২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর পথে করেছিলেন ৭ গোল। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে মাত্র দুই ম্যাচ খেলেই গোল করেছেন ৪টি।

বিশ্বকাপে তার ১৮ গোল এসেছে ১২টি ভিন্ন দলের বিপক্ষে। সর্বশেষ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে অস্ট্রিয়া।

গ্রুপ পর্বে এখন পর্যন্ত মেসির গোলসংখ্যা ১২। সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন নাইজেরিয়ার বিপক্ষে—মোট ৩টি। ২০১৪ বিশ্বকাপে করেছিলেন দুটি, ২০১৮ সালে আরও একটি। ২০১৪ সালে ইরানের বিপক্ষেও গোল করেছিলেন তিনি। একই আসরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জালেও বল পাঠিয়েছিলেন। এবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে যোগ হয়েছে আরও দুটি গোল।

বিশ্বকাপে নিজের ষষ্ঠ আসরে এসে প্রথমবারের মতো হ্যাটট্রিকও পেয়েছেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে চলতি আসরের প্রথম ম্যাচেই করেছিলেন সেই কীর্তি। ২০২২ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে করেছিলেন একটি গোল। সৌদি আরবের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা হারলেও সে ম্যাচেও গোল করেছিলেন তিনি।

নকআউট পর্বেও মেসির অবদান কম নয়। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে করেছিলেন দুটি গোল। শেষ ষোলোতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি, কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি এবং সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও একটি গোল করেছিলেন তিনি।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email