
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) এক হয়ে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ ঘোষণা দিয়েছে। শনিবার (৩০ আগস্ট) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাব অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জোটটি আত্মপ্রকাশ করে।
আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দেশের ইসলামী রাজনীতিতে সুন্নি জোটের আত্মপ্রকাশ নতুন মেরুকরণ বলে মনে করছেন রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা। অনেকের মতে, ৫ আগস্টের পর বেশ শক্ত অবস্থানে থাকা আরেক ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামীকে ‘টেক্কা’ দিতেই নতুন এই সুন্নি জোটের আত্মপ্রকাশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের প্রতিটি এলাকায় ওই তিন ইসলামী দলের তৎপরতা থাকলেও বিশেষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রামে তাদের বেশ শক্ত অবস্থান রয়েছে। দেশের বিভিন্ন পীরের দরবার, খানকাহ, দরগাহ, মাজারের ভক্ত-অনুরক্তরা এসব দলের কড়া সমর্থক। এতো দিন নিবন্ধিত দল তিনটি আলাদাভাবে কর্মতৎপরতা চালালেও ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ নামে এক প্ল্যাটফর্মে এলেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জুলাই ২৪-এর মতো অন্য কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে দেশে এত বেশি রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি। জুলাই ২৪ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, শহীদ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসন এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করাসহ পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ৫ আগস্ট পরবর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিগত এক বছরে মব ভায়োলেন্স, সন্ত্রাস, খুন, গুমসহ অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অতীতের ন্যায় অব্যাহত রয়েছে। চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, দখল-বেদখলসহ বিভিন্ন ঘটনা জনজীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। এ পর্যন্ত শতাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজারসহ ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে।
সরকারের নির্লিপ্ত ও নির্বিকার ভূমিকা জনমনে ক্রমাগত ক্ষোভ বাড়ছে উল্লেখ করে সুন্নি জোটের নেতারা বলেন, জাতীয় জীবনে প্রতিহিংসার রাজনীতি জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। নির্বাচনের সময় ঘোষিত হলেও এখনো এই সংক্রান্ত ধোঁয়াশা কাটেনি। বিগত এক বছরেও সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ দেখা যায়নি। উল্টো, সরকার সংশ্লিষ্ট অনেকেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। যা ২৪-এর আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পিআর পদ্ধতি একটি নতুন কনসেপ্ট, যা জনগণের মধ্যে সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া জাতীয় নীতি নির্ধারণে সকল নিবন্ধিত দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা, জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন থানায় লুট হওয়া এবং সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য কম্বিং অপারেশন পরিচালনা, অবৈধ অর্থ পাচার রোধ ও ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ, নির্বাচনের পূর্বে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা, দুর্নীতিবাজ, আদালতের রায়ে দণ্ডিত সন্ত্রাসী, ঋণখেলাফি, বিদেশে অর্থ পাচারকারী ও কালো টাকার মালিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়।
এছাড়া ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মহান স্বাধীনতার চেতনার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, শান্তিপূর্ণ ও অহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ১৭ দফা দাবি ও ২১ দফা ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
জুলাই আন্দোলনে লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কম্বিং অপারেশন চালানো।
নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, ঋণখেলাফি ও অর্থপাচারকারীদের অযোগ্য ঘোষণা।
শান্তিপূর্ণ ও অহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা।
সুদমুক্ত ও ন্যায্য অর্থনীতি গড়ে তোলা।
কৃষি, শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
প্রবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও নতুন বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার সৃষ্টি।
কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক শিক্ষা নীতি প্রণয়ন এবং মাদরাসা, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়।
নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষা, মাদক, জুয়া ও অনৈতিক সংস্কৃতি নির্মূল।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শায়খুল হাদিস অধ্যক্ষ আল্লামা জয়নুল আবেদীন জুবাইর। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যক্ষ আল্লামা স উ ম আবদুস সামাদ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আল্লামা এম এ মতিন, পীরে তরিকত আল্লামা ছৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী ও পীরে তরিকত আল্লামা ছৈয়দ সাইফুদ্দীন আল হাসানী। সঞ্চালনা করেন মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন পীরে তরিকত আল্লামা ছৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আলহাসানী, অধ্যক্ষ আল্লামা এস এম ফরিদ উদ্দীন, আল্লামা আবু সুফিয়ান আবেদী আলকাদেরী, অ্যাডভোকেট আবু নাছের তালুকদার, এম সোলায়মান ফরিদ, অধ্যক্ষ এম ইব্রাহীম আখতারী, আল্লামা খাজা আরিফুর রহমান তাহেরী, আল্লামা মোশাররফ হোসেন হেলালী, মাওলানা আশেকুর রহমান হাশেমী, মাওলানা বাকি বিল্লাহ আজহারী, মাওলানা রুহুল আমিন ভূঁইয়া চাঁদপুরী, স ম হামেদ হোসাইন, এইচ এএম মুজিবুল হক শাকুর, ঢালি কামরুজ্জামান হারুন, মোহাম্মদ আবদুর রহিম, অধ্যক্ষ আলী মোহাম্মদ চৌধুরী, মোহাম্মদ সোহেল সামাদ বাচ্চু, এ এম মঈনউদ্দীন চৌধুরী হালিম, মাওলানা ওয়াহেদ মুরাদ, মাসুম বিল্লাহ মিয়াজি, এড, ইসলাম উদ্দীন দুলাল, তরিকুল হাসান লিংকন, এডভোকেট ইকবাল হাসান, মোহাম্মদ ইব্রাহীম মিয়া, আবদুল হাকিম, এস এম তারেক হোসাইন, কাজী জসিম উদ্দীন আশরাফী প্রমুখ।