
আমার ক্যাম্পাস জীবন শুধু ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা ডিগ্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। এটি ছিলো এমন এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। সেখানে যেমন আনন্দময় মূহুর্তগুলোও ছিলো তেমনি সংগ্রামের ইতিহাসও ছিলো। দীর্ঘ সময় ফ্যাসিবাদী আমলে ক্লাস-পরীক্ষা দেওয়া তো দূরের কথা ক্যাম্পাসে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে রেখেছিলো ফ্যাসিস্ট সরকার। দীর্ঘ সময় ফেরারী জীবন ও কারাগারে কাটাতে হয়েছে।। গুম, হামলা, মামলা ও নির্যাতনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে শিক্ষাজীবন হয়ে পড়েছিলো অনিশ্চিত। ফলে আনন্দময় যা ঘটার সব ৫ ই আগষ্টের পরই ঘটেছে। যেখানে কিছু মুহূর্ত সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিছু আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, কিছু অনুভূতি কোনো ছবিতে ধরা পড়ে না। তবুও সেগুলো হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকে। আমার ক্যাম্পাস জীবনের অসংখ্য স্মৃতির ভিড়ে এমন তিনটি মুহূর্ত আছে, যেগুলো মনে পড়লেই আজও বুকটা অন্যরকম আবেগে ভরে ওঠে। সেগুলো যেন স্মৃতির অ্যালবামে অমলিন তিনটি অধ্যায়।
১. ৫ই আগস্ট: বিজয়ের স্লোগানে কেঁপে উঠেছিল যে সন্ধ্যা
দীর্ঘ সময় ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং স্বৈরাচার হাসিনার বিদায়ের দিন সহ-যোদ্ধাদের নিয়ে সাহসীকতার সাথে সকাল থেকে রাজপথে থাকা অবস্থায় হাসিনা পতনের খবর শুনে চট্টলার রাজপথে বিজয় উল্লাস করে ক্লান্ত হয়ে শরীরটা আর যাচ্ছিল না তবুও মনটা ক্যাম্পাসে সহ-যোদ্ধাদের নিয়ে বিজয় উল্লাস করার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল ঠিকেই একটা বাস ভাড়া করে নিয়ে সহ-যোদ্ধাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে আসতে সন্ধা গড়িয়েছিল, সেই সন্ধ্যাটা যেন এক অন্যরকম আবেগে ভরে উঠেছিল। মিছিলে বিজয় কণ্ঠের স্লোগান, সহ+যোদ্ধাদের আলিঙ্গন, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর বুকভরা স্বস্তি সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, আমরা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী। সেই সন্ধ্যার অনুভূতি আজও হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে আছে।
১. চাকসু নির্বাচন: ত্যাগের প্রতিদান, বিশ্বাসের বিজয় কিংবা পরাজয়
স্কুলে পড়াকালীন ছাত্ররাজনীতিতে আসার যে আগ্রহ ছিলো তার পিছনে কারণ হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ছাত্র নেতৃত্ব দেওয়া এবং ক্যাম্পাসে থাকাকালীন সময়ে যদি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় তাতে ভিপি, জিএস, এজিএস এই তিনটি পদের যেকোনো একটি পদে নির্বাচন করে নির্বাচিত হওয়া। যথারীতি হাসিনা পতনের পর সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু ছোট ভাইদেরকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আগ্রহ থাকায় নিজের স্বার্থকে এবং দীর্ঘ সময়ে লালন করা স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে বহু ঘাতপ্রতিঘাত অতিক্রম করে চাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলে ছোট ভাইদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা করেছি; সফলও হয়েছি এবং এই সফলতার পেছনে যে কত লুকায়িত সংগ্রাম ও ঘটনা রয়েছে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও আমি জানি। চাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে এজিএস নির্বাচিত হওয়া এই একটি বিজয়ের পেছনে দূর থেকে ছাত্রদলের বিপ্লবী সভাপতি রাকিব ভাইয়ের তদারকি ও নির্দেশনা ,সাধারণ সম্পাদক নাছির ভাইয়ের স্বশরীরে দীর্ঘ সময় থাকা ও বিচক্ষণতা ,কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বাসেত ভাই,কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে মাসুম ও রাজু’র অক্লান্ত পরিশ্রম ও তদারকি,এজিএস প্রার্থী ও তার বেশ কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর আন্তরিক প্রচেষ্টা ,চবি ছাত্রদলের সভাপতি মহসিন ভাই ও ইয়াছিন সহ নিজ সহযোদ্ধাদের নিয়ে কত নির্ঘুম রাত, কত অপূর্ণ খাওয়াদাওয়া, কত মেকানিজম ,কত অসমাপ্ত ব্যক্তিগত কাজ আর কতটা মানসিক চাপ লুকিয়ে ছিল সেটা হয়তো খুব কম মানুষই জানে। কখনো নিজের ক্লান্তির কথা ভাবিনি, কখনো নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক, শারীরিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকেও গুরুত্ব দিইনি। কারণ প্রাপ্তির খাতায় আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বপ্ন ছিল না; ছিল শুধু একটাই আকাঙ্ক্ষা ছোট বেলায় নিজের স্বপ্নকে ছোট ভাইকে দিয়ে পূরণ, ছাত্রদল ও নিজের অনুজদের বিজয়ী হিসেবে দেখা।
ফলাফল ঘোষণার সেই মুহূর্তে যখন ছোটভাই এজিএস এর বিজয়ের সংবাদ পেলাম এবং শপথ অনুষ্ঠানের দিন যখন ছাত্রদলের প্যানেলের ছোট ভাই ও নিজের কর্মী ছাত্রসংসদের দায়িত্ব পেল তখন মনে হয়েছিল প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি নির্ঘুম রাত সার্থক হয়ে গেছে। একইসাথে কষ্ট ও আনন্দ দুই অনুভূতির সংমিশ্রণে চোখ অশ্রুতে ভিজে যাচ্ছিলো। এই অর্জন আমার একার নয়; এটি আমার সহযোদ্ধাদের বিশ্বাস, ভালোবাসা, সংগ্রাম আর ত্যাগের প্রতীক। এই স্মৃতি আমৃত্যু হৃদয়ে বহন করব। তবে আজ জানিনা সেই অর্জনে আমি ও সহযোদ্ধারা কতটা উচ্চারিত হচ্ছি!
৩. বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম মিশর: প্রিয় দলের খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসা
গ্রামের বাড়ির পাশ্ববর্তী মাতামুহুরি নদীর তীরের বালুচরে শৈশবে কত ফুটবল খেলেছি এবং ছোটবেলা থেকে প্রিয় ফুটবল দল হিসেবে আর্জেন্টিনাকে নান্দনিক ফুটবল দল হিসেবে ভালোবেসেছি। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই প্রতি বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনাকে নতুন ভাবে নতুনরূপে স্বাগত জানাই। গতকালই ছিলো প্রিয় দলের তেমনই একটি ম্যাচ। বিশ্বকাপের এই ম্যাচে মনে হচ্ছিল স্বপ্নটা বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খাদের কিনারা থেকে ফিরে এসে আর্জেন্টিনার জয় যেন আবারও শিখিয়ে দিল শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত আশা হারানো যায় না; রাজনীতিতেও অনেকটা এমন। সহযোদ্ধা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেই উন্মাদনা, শেষ মুহূর্তের চিৎকার, আর বিজয়ের আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরার অনুভূতি সব মিলিয়ে এটি আমার ক্যাম্পাস জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও আনন্দঘন স্মৃতিগুলোর আরেকটি।
সময় হয়তো অনেক কিছু বদলে দেবে, কিন্তু এই তিনটি মুহূর্ত আমার কাছে শুধু স্মৃতি নয় এগুলো আমার জীবনের তিনটি অমূল্য অনুভূতি, তিনটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
-আব্দুল্লাহ আল নোমান
.. সাধারণ সম্পাদক,
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল,
. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।







